+

বাক্সবন্দী আগুনের গল্প

সরেজমিনবার্তা | নিউজ টি ২৪ দিন ২ ঘন্টা ২৮ সেকেন্ড আগে আপলোড হয়েছে। 2130
...

মানব সভ্যতার ইতিহাস বহু প্রাচীন। সেই প্রাগৈতিহাসিক সময়ের প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ পেরিয়ে মানুষ আজ পৌঁছেছে সভ্যতার সবচেয়ে আধুনিক যুগে। মানব ইতিহাসের প্রতিটি ধাপে দিন দিন মানুষ অনুন্নত থেকে উন্নত হয়েছে। মানু্ষের হাত ধরে এসেছে কৃষি থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের নানান আবিষ্কার। আবিষ্কারের স্পৃহায় মানুষ আজ পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশও ছুঁয়েছে! 

মানুষের আবিষ্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম এক আবিষ্কার হলো 'আগুন'। এটা এমন এক রাসায়নিক পদার্থ, যা বিধ্বংসী নিঃসন্দেহে! তবে এই আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানব সভ্যতাকে দিয়েছে সমৃদ্ধি। আগুনের আবিষ্কার নিয়ে অনেক মতবাদ রয়েছে। প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে 'হোমো ইরেক্টাস' কর্তৃক আগুন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে আগুন আবিষ্কার নিয়ে অনেক মিথও রয়েছে। গ্রীক পুরান মতে, দেবতা প্রমিথিউসের কারণে পৃথিবীতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল! আগুনের আবিষ্কার সম্পর্কে জানতে গেলে, এমন মিথ সহ নানান বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক বা প্রাগৈতিহাসিক কাহিনী সামনে আসে!

আগুন আবিষ্কারের ঘটনা যাই হোক না কেন, ভয়াল এই পদার্থটাকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় এনে মানব সভ্যতার অনেক অগ্রগতি এসেছে। আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ম্যাচবক্স। নিত্যদিনই এই জিনিসটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করে।

প্রথম আবিষ্কৃত ম্যাচের কাঠিগুলো টিনের তৈরি কৌটায় রাখা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে সচরাচর টিনের তৈরি ম্যাচবক্সের দেখা না মিললেও, নানান ডিজাইনের ম্যাচবক্স দেখা যায়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এখনকার ম্যাচবক্সগুলো কাগজ দিয়েই তৈরি হয় আর বক্সের ভেতরে থাকে ম্যাচের কাঠি। নানান দেশের ম্যাচবক্সের গায়ে ছাপা ছবিতে সেই সেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, পরিবেশ, চালচলন ইত্যাদির ধারণা পাওয়া যায়। এ কারণে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শখগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো 'ম্যাচবক্স' সংগ্রহ!

ম্যাচবক্স আবিষ্কারে যে মানুষটির কথা প্রথমে আসে, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক, একজন রসায়নবিদ। ইংল্যান্ডের স্টকটন-অন-টিজ এলাকায় জন্ম তাঁর। জীবদ্দশায় চিরকুমার এই মানুষটি ছিলেন ভীষণ প্রজ্ঞাবান এক ব্যক্তিত্ব। রসায়নশাস্ত্রের পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ছিল বলে জানা যায়। তাঁকে 'স্টকটোনের বিশ্বকোষ' ডাকা হতো!

একদিন ইংল্যান্ডের সেই রসায়নবিদ নিজের পরীক্ষাগারে কাজ করছিলেন। সেখানে এন্টিমনি সালফাইড, পটাসিয়াম ক্লোরেট, মাড় ও আঠার সংমিশ্রণের কিছু রাসায়নিক পদার্থ ছিল। এই সংমিশ্রণের কিছুটা প্রলেপ তাঁর টেবিলে থাকা একটা কাঠির উপর পড়ে। পরে উনার হাতেই সেই কাঠিটি কোনো একটা কিছুর সঙ্গে ঘষা লেগে আগুন জ্বলে উঠে। দুর্ঘটনাবশত ঘটা এই ঘটনা থেকে চমৎকার এক আবিষ্কারের দ্বার উন্মোচিত হয়ে যায় সেই রসায়নবিদের সামনে! তিনি ভাবলেন যে দাহ্যপদার্থ ও ঘর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে আগুন জ্বালানো সম্ভব! যেমন ভাবা, তেমন কাজ! ১৮২৬ সালে তিনিই প্রথম আবিষ্কার করে ফেললেন ঘর্ষণ পদ্ধতির ম্যাচ। শুরুর দিকে উনি টিনের কৌটায় ম্যাচ তৈরি শুরু করেন, এগুলো ছিল লেবেল বিহীন সরু বিশেষ কৌটা। প্রতিটি কৌটায় ১০০ টি করে কাঠি থাকতো। এসব কাঠির প্রান্তভাগে দাহ্য রাসায়নিক প্রলেপ দেয়া থাকতো আর আগুন জ্বালানোর জন্য থাকতো এক টুকরো বালু মিশ্রিত কাগজ।

লন্ডনের বিজ্ঞান জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে সেই রসায়নবিদের ব্যবসায়িক হিসেব পত্র লেখার একটি ডায়েরি। তাঁর লিখা ডায়েরি থেকে জানা যায় যে জনৈক ব্যারিস্টার মি. হ্যাক্সনের নিকট ১ শিলিংয়ের বিনিময়ে তিনি প্রথম টিন ম্যাচটি বিক্রি করে। এটি ছিল ১৮২৭ সালের ৭ এপ্রিলের ঘটনা। পরবর্তীতে সেই রসায়নবিদ কার্ডবোর্ডের বাক্সে ম্যাচগুলো প্যাকেটজাত শুরু করেন এবং ঘর্ষণের মাধ্যমে আগুন জ্বালানোর জন্য বাক্সের গায়ে বালু মিশ্রিত কাগজের টুকরো জুড়ে দেয়া হয়। তবে উনি ঠিক কত পিস ম্যাচবক্স তৈরি করেছিলেন সেটার সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

স্টকটোনের সেই রসায়নবিদ তার আবিষ্কৃত ম্যাচের কোনো পেটেন্ট করান নি। কিন্তু চমকপ্রদ এই আবিষ্কারটিকে স্যামুয়েল জোনস নামের অতি ধূর্ত একজন নিজের নামে পেটেন্ট করিয়ে নেন এবং ১৮২৯ সালে 'লুসিফার' নামে ম্যাচবক্স আনেন, যা ছিল মূল আবিষ্কারকের 'ঘর্ষণ' ম্যাচের হুবহু নকল!

তবে ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। পেটেন্ট করে ম্যাচবক্স আবিষ্কারের কৃতিত্ব অন্য একজন নিয়ে নিলেও, আগুনকে বাক্সবন্দি (ম্যাচবক্স) করার পদ্ধতির প্রকৃত আবিষ্কারক সেই রসায়নবিদকে ভুলে যান নি কেউ৷ তাই ম্যাচবক্সের প্রকৃত আবিষ্কারক হিসেবে এখনো সমাদৃত সেই রসায়নবিদ। 

১৮৪০ সালে পাশ্চাত্য বিভিন্ন দেশে ম্যাচের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়, গড়ে উঠে ম্যাচবক্স তৈরির বহু কারখানা। সেসময় ঘর্ষণ ম্যাচের মূল আবিষ্কারকের ফর্মূলা ব্যবহার করেই তৈরি হতো ম্যাচ। তবে তৎকালীন ম্যাচবক্সগুলোতে নিরাপত্তাজনিত কিছু ত্রুটি ছিল। তখন ম্যাচে দাহ্য পদার্থ হিসেবে সাদা ফসফরাসের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাছাড়া ম্যাচ তৈরির কারখানাগুলোতে তেমন উন্নতমানের কোনো যন্ত্রপাতি ছিল না। পাশাপাশি ম্যাচ শ্রমিকদের কাজ করার জন্য যথেষ্ট সুস্থ পরিবেশও পাওয়া যেতো না কারখানাগুলোতে। শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করলেও, সে তুলনায় তাঁদের পারিশ্রমিক ছিল কম! বাড়তি আয়ের জন্য শ্রমিকরা নিজেদের বাচ্চাদেরও কারখানার কাজে দিতো। সবচেয়ে নেতিবাচক বিষয়টি ছিল, ম্যাচ তৈরিতে ব্যবহৃত ফসফরাসের কারণে শ্রমিকদের অনেকের শরীরে তখন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতো। অনেক শ্রমিক মারাও গিয়েছিল। এসব কারণে ম্যাচ শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ চরমে উঠে। ম্যাচ কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে নারী শ্রমিকদের আধিক্য ছিল। ম্যাচ ফ্যাক্টরিগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ ও অন্যান্য কিছু দাবিতে ১৮৮৬ সালে 'The Match Girl Strike' নামের একটি আন্দোলনও হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে শ্রমিকদের নিরলস শ্রমের মাধ্যমে কারখানায় তৈরি ম্যাচবক্সগুলো অন্ধকার দূর করে আলোর সন্ধান দিলেও, তাঁদের ন্যায্য দাবি সম্বলিত আন্দোলনটি সফলতার আলো দেখে নি! এই আন্দোলন পরবর্তী আরো দুই যুগের বেশি সময় ধরে চলে অনিরাপদ ম্যাচবক্স তৈরি! নানান চড়াই-উৎরাই পার করে অবশেষে ১৯১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডায়মন্ড ম্যাচ কোম্পানি বাজারে এনেছিল ক্ষতিকারক দ্রব্যবিহীন নিরাপদ ম্যাচবক্স। যুগান্তকারী এই উদ্যোগের জন্য প্রতিষ্ঠানটি 'লুইস লিভিংস্টোন সীম্যান' পদকও পায়। ঘর্ষণ ম্যাচে ফসফরাস ব্যবহারের যুগ পেরিয়ে বিশ্ববাসী আজ পেয়েছে আধুনিক ও নিরাপদ বিভিন্ন ম্যাচবক্স।

উন্নত শিল্পায়নের এই যুগে নানান নকশা আর নিরাপদ ম্যাচবক্সের দেখা মেলে পৃথিবীর সব দেশে। একটি ম্যাচবক্স শুধুমাত্র আগুন জ্বালানোর জন্য ব্যবহৃত কোনো বস্তু নয়, এটি একটি শিল্পসৃষ্টি। আর ম্যাচবক্সের মূল শিল্পী হলেন সেই রসায়নবিদ, যিনি ১৮২৬ সালে নিজের আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে ঘর্ষণ ম্যাচবক্সের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। যাঁর কথা বলছি, তিনি হলেন ঘর্ষণ ম্যাচবক্সের জনক শ্রদ্ধেয় জন ওয়াকার। তাঁর উদ্ভাবিত ম্যাচবক্সগুলো 'ওয়াকার্স ফ্রিকশন ম্যাচ' নামে বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রজ্ঞাবান এই মানুষটির জন্ম ১৭৮১ সালে এবং তিনি প্রয়াত হয়েছেন ১৮৫৯ সালে। আজ ২৯ মে উনার ২৪০ তম জন্মদিন। 

জন্মদিনে আপনাকে অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি মি. জন ওয়াকার৷

লেখকঃ 
মোহাম্মদ মাকসুদুল হাসান ভূঁইয়া রাহুল
ম্যাচবক্স সংগ্রাহক, বাংলাদেশ।

...
Mohammad Maksudul Hasan Bhuiyan Rahul

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোহাম্মদ বেলাল হোছাইন ভূঁইয়া
01731 80 80 79
01798 62 56 66

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
আল মামুন

প্রধান কার্যালয় : লেভেল# ৮বি, ফরচুন শপিং মল, মৌচাক, মালিবাগ, ঢাকা - ১২১৯ | ই-মেইল: news.sorejomin@gmail.com

...

©copyright 2013 All Rights Reserved By সরেজমিনবার্তা

Family LAB Hospital
সর্বশেষ সংবাদ