প্রকাশিত : ২৬ নভেম্বর, ২০২৫, ০৫:৪৪ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চট্টগ্রামে ‘এমবি মিডিয়াব্র্যান্ডস’ এর নামে কোটি টাকার অনলাইন প্রতারণা।

এবাদুল হোসেন:

চট্টগ্রাম নগরীর ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড, বন্দরটিলা—এলাকা জুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘এমবি মিডিয়াব্র্যান্ডস’ নামের একটি কথিত অনলাইন ইনকাম প্রতিষ্ঠান। অনলাইন আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। শ্রমজীবী, গৃহিণী থেকে শুরু করে ছাত্র—অধ্যাপক পর্যন্ত অনেকেই এর ফাঁদে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্বন্ধে খোঁজ নিতে গিয়ে এক বিচিত্র ও ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছে। তথ্যসূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে ৩০০–এর বেশি অ্যাকাউন্ট খোলে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩,০০০—৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ফি নিয়েছে।

 অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিটি অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নাকি ‘ইনকাম’ হবে—এমন লোভ দেখানো হয়, যার বাস্তবে কোনো সিস্টেম নেই। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—প্রথমে ৩–৫ দিন “ডেমো ইনকাম” দেখানো হয়, পরে আরও টাকা জমা দিতে বলা হয়, এরপর অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়, ফোন রিসিভ করে না কেউ, টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠে এসেছে। এক ভুক্তভোগী শ্রমিক বলেন—“আমাগো শিফট শেষ হইলেই ফোন দিত, এই কাজ করলে মহাজনও লাগবো না—এই বলে ২৫ হাজার জমা নেওয়া হয়। শেষে দেখি অ্যাপই খোলা যায় না।” অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গণমাধ্যমকর্মীরা যখন প্রতিষ্ঠানটির অফিসে যান, তখন দেখা যায়—অফিসে নেই কোনো মূল দলিল, নেই কোনো রেজিস্ট্রেশন, নেই ব্যবসা অনুমোদন, প্রদর্শিত ট্রেড লাইসেন্সে অস্পষ্ট তথ্য। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে—ভুল তথ্য ও মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে যাচাই করে বাতিল করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, তাদের কথিত “ট্রেনিং সেন্টার” বা “ডাটা ভেরিফিকেশন সেন্টার”—কোথাও অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—ইপিজেড এলাকার বিভিন্ন কারখানার নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের টার্গেট করে এই প্রতারণা চালানো হয়েছে। “ইনকাম হবে”, “বাড়তি কাজ”, “সাইড বিজনেস”—এই আশ্বাসে অনেক শ্রমিক কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা জমা দিয়েছেন। এছাড়া ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন—“রূপসা মাল্টিপারপাস” নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালেও একই ধরনের টাকার লেনদেন হয়।

 স্থানীয়রা বলছেন—এগুলো একই চক্রের বিভিন্ন শাখা। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও বিতর্কিত তথ্য—স্থানীয় কিছু কথিত সাংবাদিক, ইউটিউবার, ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অধিকারী কয়েকজনের ছত্রছায়ায় এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে চলছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন—সুলতানা আক্তার নূরী নামের এক নারী পুরো চক্রটির নেতৃত্বে আছেন। মাত্র ৬ মাস আগেও তিনি ফুটপাতে কসমেটিকস বিক্রি করতেন, আর এখন কোটি টাকার ডিজিটাল বিজনেসের “সিইও”—যা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। জাতীয় দৈনিক সরেজমিন বার্তা–এর প্রতিবেদক সরাসরি যোগাযোগ করলে তিনি বলেন—“এই কোম্পানি লন্ডনের। আমি শুধু বাংলাদেশের এজেন্ট হিসেবে কাজ করি। গ্রাহকদের টাকা লন্ডন অফিসে যায়, আমি এখানে বেতনভুক্ত কর্মী।” তবে তিনি কোনো বৈধ প্রমাণপত্র বা চুক্তিপত্র দেখাতে পারেননি। এমনকি লন্ডনে অবস্থিত কথিত কোম্পানির নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ওয়েব ঠিকানাও নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি।

 স্থানীয়দের দাবি—নিয়মিত অফিসে “মিটিং”, “নতুন ট্রেনিং”, “লাইভ সেশন”—এসব ছিল কেবল প্রচারণার অংশ। লক্ষ্য ছিল শুধুই নতুন গ্রাহক আনা। প্রথম ব্যাচের টাকা দিয়ে দ্বিতীয় ব্যাচকে দেওয়া, প্রোমোটরদের কমিশন, লোভনীয় প্রচার—সব মিলিয়ে বড় ধরনের পিরামিড স্কিমের ছাপ পাওয়া গেছে। অনেক ভুক্তভোগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—“নূন্যতম ৫০০ টাকা হলেও এটা আমাদের মেহনতের।” কারো ৩,০০০ টাকা, কারো ৫০,০০০—তাদের কাছে এই অর্থটাই ছিল মাসিক সংসারের ভরসা। এক নারী শ্রমিক বলেন—“মেয়ের স্কুলের ফি জমাইছিলাম। সব হইয়া গেল।” এক ছাত্র জানায়—“আমার টিউশনি করে জমানো টাকা দিয়া অ্যাকাউন্ট খুলসিলাম। এখন সবাই হাসতাছে। আমি কার কাছে যাব?” অভিযোগকারীরা দৃঢ়ভাবে বলেন—এ চক্রকে গ্রেফতার করা, পুরো লেনদেন তদন্ত করা এবং ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। 

এদিকে ইপিজেড থানার অফিসার্স ইনচার্জ জনাব কামরুজ্জামান (ওসি) বলেন—এ বিষয়ে আমাদের কাছে এমন সুনিদৃষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি এবং আমার নলেজেও নেই। অভিযোগ আসলে এবং ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে তদন্ত প্রক্রিয়া চালু করা হবে। 

শেষ কথা—অনলাইন আয় নয়, অনলাইন ফাঁদ! চট্টগ্রামে অনলাইন ইনকামের নামে যে প্রতারণা চলছে—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যতদিন না এসব প্রতিষ্ঠানের বৈধ নথিপত্র যাচাই করা হবে এবং সাধারণ মানুষ সচেতন হবে, ততদিন অনলাইন প্রতারণা নতুন নতুন রূপে ছড়িয়ে পড়বে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়