মোকছেদুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার (নওগাঁ)
আজ ভয়াল ৩০ নভেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে নির্মইল ইউনিয়নের হালিমনগরে ঘটেছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞ। পাক সেনারা সেদিন স্থানীয় দোসরদের সহযোগিতায় শিহাড়া, নির্মইল ও এ এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কৃষক, সনাতন ধর্মাবলম্বী ও আদিবাসীদের ধরে নিয়ে আসে। প্রত্যেককে আড়মোড়া দিয়ে বেঁধে গুলি করে।
সন্ধ্যার ঠিক পূর্বক্ষণে খালের পড়ে এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই হত্যাকাণ্ডে ১৯ জন আদিবাসীসহ নাম না জানা প্রায় ৫০ জন নিহত হয়।
নির্মম এই হত্যাযজ্ঞে পায়ে গুলি লেগে বেঁচে যাওয়া আদিবাসী গুলু মুর্মু বলেন, ‘বেঁচে আছি ভাবতেই অবাক লাগছে। ওরা আমাদের সারি করে দাঁড় করিয়ে রেখে গুলি চালায়। মানুষের আর্তনাদে হালিমনগরের নির্জনতা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করে। পাক হানাদার বাহিনী চলে গেলে আস্তে আস্তে খালের পাড় ধরে আমি প্রথমে সৈয়দপুর এবং পরে ভারতে পালিয়ে যাই। সেখানে ক্যাম্পে চিকিৎসা গ্রহণ করে আমি আবারও গ্রামে ফিরে আসি। সেদিনের সেই স্মৃতি এখনও আমাকে আতঙ্কিত করে। যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের ১৯ জনের নাম জানা ছিল। পরবর্তী নির্মইল এবং শিহাড়া ইউনিয়ন পরিষদ যৌথভাবে স্থানটিকে বধ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্মইল ইউনিয়ন পরিষদ ও পত্নীতলা উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার এই স্থানটিকে সংরক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করে। যে ১৯ জনের নাম জানা ছিল, তাদের নামসহ একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ৩০ নভেম্বর শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখানে এসে পুষ্প অর্পণ করেন। একাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ৩০ নভেম্বর এখানে এসে অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন। তারা একটি পূর্ণাঙ্গ বধ্যভূমি হিসেবে হালিমনগরকে জাতীয়ভাবে ঘোষণারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আজকে খুব খারাপ লাগলো স্থানটি প্রায় দখল হয়ে গিয়েছে। আশা করব- মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত হালিমনগর বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং বধ্যভূমি নির্মাণ করে জাতীয়ভাবে অনুষ্ঠান যাতে এখানে করা হয়।’
১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর সকালে হলাকান্দর গ্রামের সাইফুল ইসলামকে এখানে নিয়ে আসা হয়। তিনি এবং অন্য একজন মিলে এখানে গর্ত কেটে লাশগুলোকে মাটি চাপা দিয়ে রাখে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল মালেক বলেন, ‘হালিমনগর অত্যন্ত দুর্গম একটি স্থান ছিল। এখানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের সবারই জানা। বর্তমানে স্থানটি দখল হয়ে গিয়েছে। কোন কর্তৃপক্ষ স্থানটি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ রকম চলতে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো জানতে পারবে না। আমরা আশা করব- হালিমনগর বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও জাতীয়ভাবে যেন এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।’
এর আগে হালিমনগর বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একাধিক কার্যক্রম পরিচালনা করে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও একুশে পরিষদ নওগাঁ।
সরেজমিনে হালিমনগর বধ্যভূমিতে দেখা যায়, কয়েক মাস আগে স্মৃতিফলকে যাদের নাম ছিল, সে নামগুলো আর নেই। শহীদ পরিবারের সদস্যরা যে বেদীতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করতেন, সেই বেদিও আর নেই। সবকিছু তুলে ফেলে একজন কৃষক এখানে চাষবাস করছেন। স্থানীয় নারী-পুরুষ এবং যুবাদের মুখ শোনা গেল হালিমনগর বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সংস্কারের আন্তরিক আহ্বান। কয়েকজন ব্যক্তির মুখে শোনা গেল এখানে উপজেলা প্রশাসন থেকে প্রকল্প দেওয়া হয়েছিল এবং পূর্বতন ইউনিয়ন পরিষদ সেগুলোর সঠিক ব্যবহার করেন নাই।
স্থানীয়রা বলেন, ‘আদিবাসী আর কৃষকরা আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের আর কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। ৩০ নভেম্বরে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা এখানে এসে আলো প্রজ্জলন করতো আর প্রার্থনা করতো তাহলে ও তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি পেত। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করব- যাতে স্থানটিকে সংরক্ষণ করা হয় এবং যথাযোগ্য মর্যাদায় ৩০ নভেম্বরকে হালিমনগর দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়।’