প্রকাশিত : ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ০৬:৩৬ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রক্তাক্ত রাত: কান্দিপাড়ায় রাজনৈতিক কোন্দলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সাদ্দাম—শোকের মাতম পরিবারে

এনামুল হক আরিফ 

ব্যুরো চিফ ব্রাহ্মণবাড়িয়া 

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দিবাগত রাত ছিল অন্য সব রাতের মতোই নীরব। কিন্তু রাত ২টার ঘড়ি বাজতেই, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভয়ংকর গুলির শব্দ। ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, মানুষের কণ্ঠে কান্নার সুর, আর এক পরিবারের জন্য নেমে আসে অসহনীয় শোকের কালো অন্ধকার।সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান শহর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোস্তফা কামাল মস্তু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ সাদ্দাম মিয়া (৩৭)। এক মুহূর্তে পরিবারের ভরসা, দুই শিশু কন্যার স্নেহভাজন বাবা, স্ত্রীর জীবনের আশ্রয়—সবকিছুর অবসান ঘটে নিষ্ঠুর সন্ত্রাসীদের হাতে।গুলির শব্দে দৌড়ে গিয়ে রক্তাক্ত সাদ্দাম—মর্মান্তিক দৃশ্য,স্থানীয়রা জানান, তারা প্রথমে ৩–৪ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হন। রাস্তার মোড়ে গিয়ে দেখেন, সাদ্দাম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে, তার বুক ও গলার কাছে রক্তের স্রোত বইছে। কেউ তাকে নাম ধরে ডাকছিল, কেউ দৌড়ে গাড়ি আনতে ছুটছিল—তবে সব প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান “তিনি আর নেই।”এই চারটি শব্দ যেন বজ্রাঘাত হয়ে নেমে আসে পরিবারের ওপর।পরিবারের আর্তনাদ: “আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে”
নিহতের বাবা মোস্তফা কামাল মস্তু, যিনি নিজেই একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তি, শোকে ভেঙে পড়েও জানালেন তাঁর ক্ষোভ ও বেদনা—
“আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি, এটাই কি আমার অপরাধ? সন্ত্রাসীরা আমাকে না পেয়ে আমার সন্তানকে হত্যা করেছে। গুলি করেছে, গলায় ছুরি মেরেছে… কী অপরাধ করেছিল আমার ছেলে?”কথা বলতে বলতে একসময় তিনি ভেঙে পড়েন। পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।তিনি আরও বলেন “বিএনপি'র দুই গ্রুপের সংঘর্ষের জের ধরেই আমার ছেলেকে বলি দেওয়া হয়েছে। তারা পরিকল্পনা করেই তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। এটার বিচার না হলে এমন মৃত্যু থামবে না।”
স্ত্রীর হৃদয়বিদারক বর্ণনা: ‘রাত একটা পর্যন্ত আমার সঙ্গে ছিল’ সাদ্দামের স্ত্রী ফারজানা আক্তারের মুখে সেদিনের ভয়াবহতার আরও করুণ ছবি ফুটে ওঠে—“রাত একটা পর্যন্ত সাদ্দাম আমার সাথে ছিল। আমরা কথা বলেছি, হাসাহাসি করেছি। আমি একটু পরেই ঘুমাতে গেলাম। হঠাৎ কেউ এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল— ভাবি, ভাইকে গুলি করেছে!বাইরে গিয়ে দেখি… আমার স্বামী রক্তের মধ্যে পড়ে আছে!”তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন—“আমার দুই মেয়ে—এত ছোট। তাদের বাবা কেড়ে নিল সন্ত্রাসীরা। তারা কি একবারও ভাবল না এসব শিশুর ভবিষ্যৎ কী?”সাদ্দামের দুই কন্যা বাবার মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল—দৃশ্যটি উপস্থিত সবাইকে আবেগে আপ্লুত করে।এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে—দুই গ্রুপ মুখোমুখি,স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে:লায়ন শাকিল গ্রুপ ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলীপ গ্রুপ এর মধ্যে টাকা লেনদেন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে।দুই পক্ষই ধারাবাহিকভাবে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। মাঝখানে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন—বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়।রাত ১২টার দিকে ফারুকীবাজারে ছিনতাই ও মারধরের ঘটনা ঘটে।এতে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও একটি মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।ক্রমাগত অপরাধে পুরো এলাকায় ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে; দোকানদাররা আগেভাগেই দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন।সাদ্দামকে থানায় নেওয়ার কথা বলে ডেকে আনা হয়—অভিযোগ স্থানীয়দের
কান্দিপাড়ার বাসিন্দারা জানান, হামলার আগের কয়েক মিনিট আগে সাদ্দামকে কেউ একজন “থানায় যাওয়ার জন্য” ঘর থেকে ডাকে। কিছুক্ষণ পরে তার লাশ পাওয়া যায়।
তারা বলেন“এটা পরিকল্পিত। তাকে বাইরে বের করার জন্য এমন অজুহাত দেওয়া হয়েছে।”
পুলিশের বক্তব্য: “তদন্ত চলছে, যেকোনো সময় অভিযান”ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি আজহারুল ইসলাম বলেন—“আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ঘটনাটি তদন্ত করছি।এখনই কোনো গ্রুপ বা ব্যক্তিকে দায়ী বলা যাচ্ছে না।নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।”তিনি আরও জানান—এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে,সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে এলাকা থমথমে—চারদিকে আতঙ্ক, মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেহত্যাকাণ্ডের পর কান্দিপাড়া এলাকায় যেন এক ধরনের দমবন্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।যে রাস্তায় মানুষ রাতে আড্ডা দিত, আজ সেখানে ভরপুর নীরবতা।সবাই বলছে—“এই এলাকায় সন্ত্রাসীরা মাথা তুলছে, বড় ঘটনার আশঙ্কা আছে।”শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই নিরাপদ মনে করছেন না।অনেকে অন্যত্র আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন।রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া—শোকের ছায়া সাদ্দামের পরিবারে,সাদ্দামের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।শহরের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে।শোক জানাতে সারাদিন মানুষের ভিড় লেগেছে তাদের বাড়িতে।সাদ্দামের দুই কন্যা বাবার ছবি আঁকড়ে ধরে কাঁদছে—সেই কান্না যেন পুরো এলাকার হৃদয়ে ব্যথার দাগ কেটে দিচ্ছে।এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক কোন্দলের নতুন অধ্যায়?স্থানীয়দের মতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা,সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা,টাকা লেনদেনের দ্বন্দ্ব,এবং সম্প্রতি ধারাবাহিক সংঘর্ষ,সব মিলিয়ে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।অনেকেই বলছেন,“আজ সাদ্দাম, কাল অন্য কেউ—এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে না আনলে বড় বিপদ হবে।”

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়