প্রকাশিত : ০৯ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:৫৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মানিকগঞ্জকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে দৃশ্যমান করতে ডেরা রিসোর্ট

আবুল হোসেন -স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট 

ঢাকা আরিচা বিশ্বরোডের মানিকগঞ্জের  বানিয়াজুরি,জোকা বাসস্ট্যান্ডের উত্তরে বালিয়াখোড়া ইউনিয়নে অবস্থিত ডেরা রিসোর্ট মানিকগঞ্জ জেলা কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে দৃশ্যমান করতে অপরিহার্য অবদান রাখবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশ-বিদেশি পর্যটক এবং  মানিকগঞ্জ জেলা বাসি। 

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা'র তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১২০ কোটি মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। এই বিশাল সংখ্যক পর্যটক  দেশ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন—

 প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য,
 নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা,
 আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।

আফ্রিকার কিছু দেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটক টানতে পারে না। অপরদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার বা মালদ্বীপ তুলনামূলক ছোট দেশ হলেও আইনের শাসন ও পর্যটকবান্ধব নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে আজ বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে পর্যটন খাত ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন বা সিলেটের মতো অঞ্চলে পর্যটকরা ভিড় করছেন। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনের ঘাটতি এ খাতকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

মানিকগঞ্জ জেলার দিকে তাকালে দেখা যায়, ঢাকা থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও এই জেলা পর্যটনের মূল স্রোতে কখনোই আসতে পারেনি। অথচ এখানকার নদী, খাল-বিল, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং জনমানুষের আতিথেয়তা যথেষ্ট আকর্ষণীয়। কিন্তু শিল্পায়ন ও পর্যটনে উন্নতির ক্ষেত্রে মানিকগঞ্জ পিছিয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জের মতো জেলার তুলনায়।

এই প্রেক্ষাপটে মানিকগঞ্জে গড়ে ওঠা ডেরা রিসোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা এই পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়; বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পর্যটনে মানিকগঞ্জকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করার একটি সুযোগ।

এমন একটি রিসোর্ট আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করেছিল। ঢাকা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে পাঁচ তারকা মানের হোটেল–রিসোর্ট গড়ে ওঠা মানিকগঞ্জকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে দৃশ্যমান করতে পারত। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানিকগঞ্জের ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তুলতে পারত।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে রিসোর্টটি বন্ধ করার নানা পায়তারা চলছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, আইনি দ্বন্দ্ব এবং প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ জড়িয়ে পড়ায় এই বিনিয়োগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিসোর্টটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

প্রশ্ন হলো—কেন তারা সময়মতো লাইসেন্স পেল না?

তথ্য বলছে, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ দুই বছর পার হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর লাইসেন্স অনুমোদন দেয়নি। বরং দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আবেদন ঝুলে ছিল।

এখন প্রশ্ন উঠছে
যদি আবেদন ঝুলে থাকে, তবে এর দায় উদ্যোক্তার, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের?
উদ্যোক্তা আইনের পথে আবেদন করলেও যদি তারা অনুমোদন না পান, তবে কি তা উদ্যোক্তার ‘অপরাধ’?
এ ধরনের জটিলতা কি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয় উদ্যোক্তাদের চাপে রাখার জন্য?

বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ীই অভিযোগ করেন যে, সরকারি লাইসেন্স বা অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কখনো আবার অনানুষ্ঠানিক চাপ বা অযৌক্তিক শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতাও থাকে।

ডেরা রিসোর্টের ক্ষেত্রেও যদি কর্তৃপক্ষ সময়মতো লাইসেন্স প্রদান না করে থাকে, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং উদ্যোক্তা–বিনিয়োগকারীদের প্রতি অবিচার। একদিকে সরকার বিনিয়োগ আহ্বান জানায়, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা ন্যায্য প্রক্রিয়ায় অনুমোদন না পেয়ে হয়রানির শিকার হন। এতে উদ্যোক্তাদের আস্থা নষ্ট হয়।

ডেরা রিসোর্ট বন্ধ হলে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে 
উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করবে – কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও যদি লাইসেন্স না পেয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, তবে নতুন করে কেউ আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।

অর্থনৈতিক ক্ষতি – কর্মসংস্থান হারাবেন স্থানীয় মানুষ। সরবরাহ চেইনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

 পর্যটন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে – মানিকগঞ্জ পর্যটন মানচিত্রে পিছিয়ে যাবে। বিদেশি পর্যটকরা এটিকে অনিরাপদ ও অনিশ্চিত অঞ্চল ভাবতে পারেন।

জাতীয় পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব – সরকার যে পর্যটনকে রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে, তা ব্যাহত হবে।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বহু দেশেই বিনিয়োগকারীরা প্রশাসনিক জটিলতায় বিপাকে পড়েন। তবে যেখানে আইনের শাসন কার্যকর, সেখানে দ্রুত সমাধান হয়। উদাহরণস্বরূপ—

সংযুক্ত আরব আমিরাত: উদ্যোক্তারা অনলাইনে কয়েক দিনের মধ্যে ব্যবসা লাইসেন্স পান। তাই সেখানে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন শিল্প সমৃদ্ধ।

শ্রীলঙ্কা: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। ফলে দেশটির পর্যটন খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে।

বাংলাদেশ যদি পর্যটন ও বিনিয়োগে এগোতে চায়, তবে আমিরাত বা মালয়েশিয়ার মতো উদাহরণ অনুসরণ করে লাইসেন্স–সংক্রান্ত প্রক্রিয়া দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে।

সমাধানের পথ
ডেরা রিসোর্টের মতো প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি।

 লাইসেন্স প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা – আবেদন পাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ঝুলিয়ে রাখা যাবে না।

দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা – যদি কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে আবেদন আটকে রাখেন, তার জবাবদিহি থাকতে হবে।

 আইনের শাসন নিশ্চিত করা – প্রভাবশালী বা গোষ্ঠীস্বার্থের কারণে প্রতিষ্ঠান বন্ধ না হয়।

উদ্যোক্তা–প্রশাসন সংলাপ – নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে হবে।

ডিজিটাল প্রক্রিয়া – লাইসেন্স আবেদন ও অনুমোদন পুরোপুরি অনলাইনে করলে জটিলতা কমবে।

ডেরা রিসোর্ট শুধু মানিকগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের উদ্যোক্তা সমাজের আস্থার প্রতীক। লাইসেন্স ইস্যুতে দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে যদি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর দায় শুধু উদ্যোক্তার নয়—বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও।

একটি দেশের পর্যটন শিল্প আসলে তার আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি। ডেরা রিসোর্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কি বিনিয়োগবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব দেশ হিসেবে এগোবে, নাকি প্রশাসনিক জটিলতা ও স্বচ্ছতার অভাবে আস্থা হারাবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়