১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৮:৫৭

এখনও অবহেলিত হাটহাজারীর ত্রিপুরা পল্লীর মুনাই পাড়া !

::মো.আলাউদ্দীন::
সোনাই ও মুনাই এ দুই পাড় নিয়ে হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের ত্রিপুরা পল্লী গঠিত। মুনাই পাড়াতে হিন্দু ধর্ম পালন করা প্রায় ৫৬টি ত্রিপুরা পরিবারের বসবাস। আর সোনাই পাড়াতে বসবাস ৫২টি পরিবারের। গত মঙ্গরবার(২১আগস্ট)সোনাই পাড়ায় হাম রোগের ভাইরাসে আক্রন্ত হয়ে এক পরিবারের দুই শিশু সহ এক সপ্তাহের মধ্যে ৪ শিশুর মৃত্যু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ৩২ জন এ রোগে আক্রান্ত রোগীর ভর্তির খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে গত ০১ সেপ্টে¤র শনিবার পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী,উপজেলা প্রশাসন,স্বাস্থ্য অধিদফতর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা,ইউনিসেফ,আইইসিডিআর প্রতিনিধি দল সহ বিভিন্ন সংগঠন ত্রিপুরা পল্লীর সোনাই পাড়া পরিদর্শনে গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নেন এবং সেখানে বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। তবে এখনও পর্যন্ত আর তেমন কোনো সংগঠনের পা পড়েনি মুনাই পাড়াতে,অবহেলিত রয়ে গেছে ঐ মুনাই পাড়া এমনটাই ধারনা সেখানকার বাসিন্দাদের।

সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে,সোনাই পাড়া থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার পশ্চিমে এ মুনাই পাড়াতে যাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই। পাহাড় থেকে বেয়ে আসা ছড়া পাড়ি দিয়ে কৃষি জমি ও পাহাড়ের পাশ ধরে পায়ে হেটে এ পাড়ায় যেতে হয় । এ পাড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক,শুকনাতেও ভূমি সমতল পথের বহু স্থানে কাঁদা পানি থাকে প্রায় সময়। মুনাই খালের শাখা ছড়া পারাপারের জন্য নেই কোনো সাকো বা কালভার্ট। বর্ষাকালে এ ছড়া পানিতে পুর্ন হলে ঝুঁকি নিয়ে সাঁতার কেটে পার হতে হয় উত্তর পাড়ে বসবাস করা অন্তত ২৫ টি পরিবারের সদস্যদের। এ পাড়ার কোমলমতি ছেলে-মেয়েরা বঞ্চিত শিক্ষার আলো থেকে,নেই কোনো সুপেয় পানির ব্যবস্থা,বিদ্যুৎ,স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য সেবাও।

তাদের সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, অধিকাংশ ত্রিপুরারা পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করে সে কাঠ কাধে নিয়ে বাজারে গিয়ে বিক্রী করে এবং জুম চাষ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করলেও বর্তমানে সে সুযোগটাও একেবারে কমে গেছে।কারন হিসাবে মুনাই পাড়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ত্রিপুরা যুবক জানান, প্রভাবশালীরা এখন প্রায় পাহাড় সরকার থেকে লিজ নিয়ে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা লাগিয়ে দিচ্ছে।যার ফলে এখন আমরা আগের মত জুম চাষ করতে পারিনা আর এ কারনে আমাদের অভাব অনটনও এখন অনেক বেড়ে গেছে,হিমশিম খেতে হচ্ছে সংসারের নিত্য প্রয়োজন মেটাতে। এবং মুনাই ছড়ার উত্তর পাশের টিলায় বসবাস করা প্রায় ২৫টি পরিবারের সবাই খোলা স্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করে বলেও জানা যায়। পাড়ার ৫৬ টা পরিবারের প্রায় সবাই বন বাদাড়েই প্রাকৃতিক কাজ সারে। আবার সে গুলো বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে খালে বিলে ও পার্শ্ববর্তী ছড়ার পানিতে পড়ে। আর এ পানি পান করে প্রতিনিয়ত তারা শিকার হচ্ছে পেটের পীড়া সহ বিভিন্ন প্রকার রোগের। বর্ষার দিনে মুনাই ছড়াতে পানি পূর্ন থাকায় ছড়া পাড়ি দিয়ে এ পাড়ার মুল রাস্তায় আসাটাও অসম্ভব হয়ে পড়ে ঐ ২৫টি পরিবারের সদস্যদের। এ মুনাই পাড়াতে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট রয়েছে। এখানকার প্রায় সবাই রান্নার কাজে ও খাবার পানি হিসাবে পান করে পাহাড় থেকে শুরু হয়ে মুনাই খালের সাথে মিশে যাওয়া মুনাই শাখা ছড়ার পানি। একটি টিউবওয়েল এ পাড়াতে থাকলেও সেটা নস্ট হয়ে পড়ে আছে প্রায় বছরেরও অধিক সময় ধরে। নস্ট এ টিউবয়েল বাশের কঞ্চির সাহায়্যে স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে কোনো মতে ফোটা ফোটা পানি পড়ার যে ব্যবস্থা করেছে তাতে একটা কলসি পূর্ন হতে প্রায় আধ ঘন্টারও বেশী সময় লাগে। যার কারনে তাদের বাধ্য হয়েই ঝুকি নিয়েই সাংসারিক কাজ কর্ম সহ পানির যাবতীয় প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে মুনাই ছড়ার পানি দিয়ে। এ পল্লীর মুনাই পাড়ার গৃহিনী চম্পা ত্রিপুরা জানান,পানির কলটা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বছরেরও বেশী সময় ধরে, যদি সরকারের পক্ষ থেকে এ নস্ট পানির কলটা মেরামত করে দেয়া হতো তবে মুনাই পাড়ার জনগন কোনোমতে বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজনটা অন্তত মেটাতে পারতো।

সোনাই পাড়ার ৫২টি পরিবারের প্রায় অর্ধেক পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ গেলেও মুনাই পাড়ার ধারে কাছেও যায়নি বিদ্যুৎ সুবিধা। ফলে সন্ধ্যা হলেই এ পাড়ায় নেমে আসে গভীর অন্ধকার। কেরোসিন কেনার সামথ্য না থাকায় এখানকার প্রায় পরিবার সূর্য ডুবার সাথে সাথে রাতের খাবার শেষ করে অন্ধকার নেমে আসা মাত্রই সুন্দর সকাল দেখার প্রত্যাশায় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যান। গত দুই তিন মাস পূর্বে বিদেশী সংস্থার দু’জন মহিলা কর্মী মুনাই পাড়া পরিদর্শন করে একমাত্র ধর্মীয় উপসনালয়ে ১টি, চলাচলের জির্নশির্ন কাদা মাখা পথে ৪ টি, ৫৬ টি পরিবারের মধ্যে ১৫টি পরিবারের প্রতি পরিবার বা ঘরে একটি করে মোট পনেরটি সোলার লাইট দিয়ে অন্ধকার এ পাড়ার কিছু অংশকে আলোকিত করেছিলেন। দুঃখের বিষয় ২ মাস যেতে না যেতেই বর্তমানে পনেরটি ঘরের সবগুলো সোলার লাইট নস্ট হয়ে পড়ে আছে আর রাস্তার ৪ টি লাইটের মধ্যে দুটি লাইট একটু একটু জ্বললেও বাকী দুটির যায় যায় অবস্থা।

অপর দিকে নিজেদের উদ্যোগে মাটি দিয়ে তৈরী মুনাই পাড়ার একমাত্র ধর্মীয় উপসানালয়টিও(মন্দির)জরাজীর্ন হয়ে পড়ে আছে। এ মন্দিরটির নিরাপত্তার জন্য নেই কোনো বেস্টনী, মন্দিরের কাঠের তৈরী দুটি জানালাও ভাঙ্গা, চার পাশ ঝোপ জঙ্গলে ভরা। প্রার্থনা করার জন্য মন্দিরে আসা যাওয়ার কোনো রাস্তাও নেই। মুনাই ছড়ার পানি পথ পাড়ি দিয়ে আসা যাওয়া করতে হয় একমাত্র এ উপসানালয়টিতে। সুকুমার ত্রিপুরা বলেন, মুনাই ছড়ার এপার থেকে ওপারে চলাচলের জন্য একটা সাকো বা কালভাটের ব্যবস্থা করলে উত্তর পাড়ে বাস করা জনগনের জীবনযাপন যেমন সহজ হবে তেমনি প্রার্থনার জন্য মন্দিরে আসা যাওয়া করাতেও আর কোনো বাধা থাকবে না।

ঢাকা থেকে আসা স্বাস্থ্য অধিদফতরেরে এক প্রতিনিধি জানান, সুপেয় পানির তীব্র সংকট থাকায় পাশ্ববর্তী ছড়া থেকে পানি এনে পান করেন তারা। এছাড়া সুনিদিষ্ট স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে যে কোনো সময় তারা বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে অসুস্থ হতে পারে। এজন্য তাদেরকে সচেতন করতে হবে এবং তাদের জন্য সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ত্রিপুরা পল্লীর মুনাই পাড়ার কয়েকজন বাসিন্ধা বলেন, চার জন শিশুর প্রানের বিনিময়ে এ পল্লীতে মানুষের নজর পড়েছে। তবে সবাই সোনাই পাড়া নিয়ে ব্যস্থ, পরিদর্শন, ত্রাণ বিতরণ সব হচ্ছে সোনাই পাড়াতে, আমাদের মুনাই পাড়াতে তেমন কেউ আসেইনি, তবে ইউনুচ গনি চৌধুরী এসে কিছু ত্রাণ দিয়েছিলেন। আর কোনো নেতা বা সংগঠন এখানে কিছু দেয়নি।শুধুমাত্র ভোটের সময় প্রার্থীরা এলাকায় আসে। ভোট শেষ হলে কেউ তাদের খবর রাখেনা। অনেক পরিবারের সন্তানদের জন্মনিবন্ধনও নাই। এ ত্রিপুরা পল্লী দুর্গম এলাকায় হওয়াতে এ পল্লীর জনগন নানা ধরনের সরকারী সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের দেখারমত কেউ নেই বললেই চলে। তারা এ দুর্গম ত্রিপুরা পল্লীর দুই পাড়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা সহ সরকারী বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয়ার জোর দাবী জানান।

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চৌধুরী জানান, এরকম একটা জনগোষ্ঠি ঐ এলাকায় আছে তা সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান কখনো আমাদের জানায়ওনি। ইতোমধ্যে ত্রিপুরা পল্লীর সোনাই পাড়াতে বিশুদ্ধ পানির জন্য গভীর নলকূপ, ২০টি টয়লেটের জন্য রিং স্লেপ এবং তাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ত্রিপুরা সংযোগ সড়কের ব্যবস্থা করার কা শুরু করেছি। সোনাই পাড়ার কাজ শেষ হলেই মুনাই পাড়ায় ১মাসের মধ্যে প্রতিটা ঘরে বিদ্যুৎ,স্যানিটেশন,২টি গভীর নলকুপের মাধ্যমে সুপেয় পানি,যাতায়াতের জন্য রাস্তারও ব্যবস্থা করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আকতার উননেছা শিউলী জানান,ত্রিপুরা পল্লীর সোনাই পাড়ার কাজে প্রায় শেষের দিকে, সোনাই পাড়ার কাজ শেষে পর্যায়ক্রমে মুনাই পল্লীতেও সুপেয় পানি,প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ,স্বাস্থ্য সম্মত টয়লেট,ও যাতায়াতের জন্য রাস্তার কাজ শুরু হবে।

উল্লেখ্য,হাটহাজারী উপজেলার ত্রিপুরা পল্লীতে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৬ আগস্ট রবিবার সকালে অন্ন বালা ত্রিপুরা(৭), ২৪ আগস্ট শুক্রবার সম রায় ত্রিপুরা(৩) এবং মঙ্গলবার ২১ আগস্ট একই দিনে অন্ন রায় ত্রিপুরা(৫) ও কিশা মনি ত্রিপুরা(৩)নামের দুই শিশু সহ মোট চারজনের মৃত্যু হয়।

প্রকাশ :সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮ ৬:৫৪ অপরাহ্ণ