১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:২৮

এখনো রায়ের কপি পায়নি খালেদার আইনজীবীরা

মামলার রায় ২৯ অক্টোবর

আদালত প্রতিবেদক :

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া দাতব্য ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে সোয়া তিন কোটি টাকা লেনদেনের মামলার রায় জানা যাবে ২৯ অক্টোবর। ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান আট বছর আগে দুদকের দায়ের করা এ মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করে মঙ্গলবার রায়ের এই দিন ঠিক করে দেন।

এ মামলার শেষ পর্যায়ের কার্যক্রম চলছে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে বসানো জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে।

এ কারাগারেই আরেকটি ভবনে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দি ছিলেন জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিছুদিন আগে সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সাড়ে আট মাসের মাথায় খালেদার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দুর্নীতি মামলার রায় হতে যাচ্ছে, যেখানে দোষী প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা হতে পারে বলে এ মামলার বাদী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল জানিয়েছেন।

কয়েকটি ধার্য তারিখে আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন না করায় বিচারের এ অংশটি বাদ দিয়েই রায়ের তারিখ নির্ধারণের জন্য আদালতে আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ।

বিচারক মঙ্গলবার তার আদেশে বলেন, “আসামিপক্ষ নানা কারণ দেখিয়ে যুতক্ততর্ক উপস্থাপন করেন নাই, কালক্ষেপণ করেছেন। সেজন্য প্রসিকিউশন যে আবেদন করেছে সে আবেদন মঞ্জুর করা হল। আগামী ২৯ অক্টোবর এ মামলা রায়ের জন্য থাকবে। খালেদা জিয়া সেদিন পর্যন্ত জামিনে থাকবেন।”

এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ না থাকলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামিপক্ষকে সে সুযোগ দেওেয়া হয়েছিল বলে আদেশে উল্লেখ করেন বিচারক।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদেশের পর সাংবাদিকদের বলেন, “বেআইনিভাবে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে যাব।”

এ মামলার চার আসামির মধ্যে খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী পলাতক। হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান আছেন কারাগারে।

খালেদাকে নির্দোষ দাবি করে তার দল বিএনপি বরাবরই বলে আসছে, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য’ থেকে তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে এই ‘মিথ্যা’ মামলা করিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।

আদালত রায়ের তারিখ ঠিক করে দেওয়ার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, “এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, সরকার যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে এটা তারই একটি প্রমাণ।”

এ মামলায় দুদকের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলেও খালেদা জিয়াসহ তিন আসামির যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করতে পারেনি আদালত। বার বার তারিখ দেওয়ার পরও আসামিপক্ষের আসামিরা যুক্তিতর্ক শুরু না করায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক ছাড়াই রায়ের তারিখ ঘোষণার আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার পর আদালতের কার্যক্রমের শুরু হলে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল প্রথমে বক্তব্য দেন। তিনি যুক্তিতর্ক ছাড়াই রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য প্রসিকিউশনের আবেদনের উপর আদেশ দেওয়ার আর্জি জানান।

এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতে বলেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এ মামলার বিচার চালানোর আদেশ চ্যালেঞ্জ করে তারা হাই কোর্টে গিয়েছিলেন। কিন্তু হাই কোর্ট তা খারিজ করে দেওয়ায় তারা আপিল বিভাগে যাবেন।

“আপিল বিভাগে কী নিষ্পত্তি হয় সেটা আমরা দেখি। আমরা এখনো রায়ের সার্টিফায়েড কপি পাইনি। আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির জন্য সময় প্রার্থনা করছি আমরা।”

খালেদার আরেক আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, “আদেশে হাই কোর্টে বলেছেন, খালেদা জিয়া আদালতে এসে মামলার কার্যক্রমে অংশ নেবেন বলে তারা মনে করেন। যেহেতু খালেদা জিয়া অসুস্থ, তিনি সুস্থ হলে অবশ্যই আদালতে আসবেন।”

এরপর দুই পক্ষ থেকে শুনানি নিয়ে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করে দেয় আদালত। খালেদার জামিন ওই তারিখ পর্যন্ত বাড়িয়ে বেলা ১২টায় এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক আখতারুজ্জামান।

পরে আদালতের বাইরে খালেদার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, “প্রসিকিউশন আবেদনে যেসব কথা লিখেছে, সেসব কথা অনুসারেই আদেশ দিয়েছেন আদালত। আমাদের কোনো বক্তব্যই আমলে নেওয়া হয়নি।”

বারবার সময় পেছানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, “সময় দেওয়া যদি অযৌক্তিক হয়, সেটাতো দিয়েছেন বিচারক। অযৌক্তিক হলে এতোদিন তিনি দিলেন কেন?”

অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন না করে বারবার সময় চাওয়ায় গত আড়াই বছর ধরে মামলার কার্যক্রম আটকে আছে। এ কারণেই তারা রায়ের তারিখের জন্য আবেদন করেছেন। আদালত তা মঞ্জুর করেছে।

কারাবন্দি খালেদাকে যেখানে শুনানিতে হাজির করা যায়নি, সেখানে রায়ের দিন তাকে কীভাবে হাজির করা হবে জানতে চাইলে কাজল বলেন, “যেভাবে হোক হাজির করা হবে।”

মামলা পরিক্রমা
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ৮ অগাস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চার জনের বিরুদ্ধে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করেন।

তেজগাঁও থানার এ মামলায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে।

তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চার জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। পরের বছরের ১৯ মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিচার শুরু হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৭ সালের গত ১ ডিসেম্বর আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করেন খালেদা। সেখানে নিজেকে ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ’ দাবি করে তিনি আদালতের কাছে সুবিচার চান।

তার আবেদনে কয়েক দফা এ মামলার বিচারক বদলে দেয় হাই কোর্ট। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা নানাভাবে সময়ক্ষেপণ করে বিচার বিলম্বিত করছেন বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার কার্যক্রম গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বকশীবাজারে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে এতিমখানা দুর্নীতি মামলার সঙ্গেই চলছিল।

৮ ফেব্রুয়ারি একই বিচারক এতিমখানা দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এর পরের সাত মাসে কারা কর্তৃপক্ষ খালেদাকে আদালতে উপস্থিত করতে না পারায় জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি দফায় দফায় পেছানো হয়। প্রতিবারই আদালতকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কথা বলা হয়।

এই পরিস্থিতিতে ৪ সেপ্টেম্বর ‘নিরাপত্তার কারণ’ দেখিয়ে কারাগারের ভেতরেই আদালত বসিয়ে এ মামলার শুনানি শেষ করার ব্যবস্থা করে সরকার। পরদিন ওই অস্থায়ী এজলাসে হাজির করা হলে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি বার বার আদালতে আসতে পারবেন না, বিচারক তাকে ‘যতদিন খুশি’ সাজা দিতে পারেন।

এরপর শুনানির দুটি নির্ধারিত দিনে কারা কর্তৃপক্ষ খালেদাকে আদালত কক্ষে আনতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে গেলেও তাদের আবেদন ১৫ অক্টোবর খারিজ হয়ে যায়।

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্কের শুনানিতে অংশ না নিয়ে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে পাঠানোসহ বিভিন্ন আবেদন নিয়ে শুনানি করতে থাকায় দুদকের আইনজীবী কাজল যুক্তিতর্ক ছাড়াই রায়ের তারিখ নির্ধারণের আবেদন করেন।

সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবার বিচারক আখতারুজ্জামান রায়ের জন্য ২৯ অক্টোবর দিন ঠিক করে দেন।

আসামিদের মধ্যে খালেদা জিয়া এ মামলায় জামিনে থাকলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় তার মুক্তি মেলেনি। বর্তমানে তিনি কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসাধীন।

এ মামলার আরেক আসামি খালেদার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় থেকে পলাতক। তিনি দেশের বাইরে আছেন বলে ধারণা করা হয়। সম্প্রতি ২১ অগাস্ট মামলার রায়ে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে।

অপর দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং মনিরুল ইসলাম খান দীর্ঘদিন জামিনে থাকার পর গত সেপ্টেম্বরে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠান বিচারক।

প্রকাশ :  অক্টোবর ১৭, ২০১৮ ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ