+

সংগ্রহের গল্প

সরেজমিনবার্তা | নিউজ টি ২১ দিন ৮ ঘন্টা ৩২ সেকেন্ড আগে আপলোড হয়েছে। 2660
...

মোহাম্মদ মাকসুদুল হাসান ভূঁইয়া রাহুলঃ
মানুষের শখের কোনো অন্ত নেই। শখ ও সৌখিনতায় মানুষ অনেক কিছুই করে বা সংগ্রহে রাখে নানান রকম জিনিসপত্র। মুদ্রা, ব্যাংকনোট, ডাকটিকিট, ম্যাচবক্স, সুগন্ধি, প্রাচীন তৈজসপত্র সহ বিশ্বব্যাপী সংগ্রাহকদের সংগ্রহের তালিকায় আছে বিচিত্র নানান জিনিস। সংগ্রহ করা হয় এমন প্রতিটি বস্তুরই একটি নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্প রয়েছে। সংগ্রহীত প্রত্যেক জিনিসই বিভিন্ন যুগ ও সংস্কৃতির সাক্ষী।

মুদ্রা, ব্যাংকনোট, ডাকটিকিট ইত্যাদি সংগ্রহের প্রতি আমার ভালোবাসা সেই স্কুলজীবন থেকে। শুরুটা ছিল ধীরগতির, পরিসরটাও ছিল ক্ষুদ্র। আমি তখন স্কুল ছাত্র। তৃতীয় কী চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। একদিন আমাদের বাসায় মালেয়শিয়া ফেরত এক আত্মীয় বেড়াতে এলেন। উনার সঙ্গে কথা বলার এক ফাঁকে মালেয়শিয়ার পয়সা দেখতে কেমন হয় কৌতুহল বশত জানতে চাইলাম। উনি মানিব্যাগ থেকে বের করে জবা ফুল ছাপাঙ্কিত একটা ১০ সেনের মুদ্রা আমার হাতে দিলেন। জীবনে প্রথমবার ভিনদেশের কোনো মুদ্রা দেখলাম! বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলাম আমি! আমার উচ্ছ্বাস বুঝতে পেরে উনি ওই মুদ্রাটি সহ আরো কয়েকটা মুদ্রা আমাকে উপহার দিলেন। সেদিনের অনুভূতিটা এত আনন্দময় ছিলো যা বলে বোঝানো যাবে না! সেই থেকে শুরু আমার মুদ্রা সংগ্রহের যাত্রা।

পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু দেশের মুদ্রা হাতে এসেছে। ব্যাংকনোট তখনো সংগ্রহ করি না। আসলে ছোট ছিলাম, তাছাড়া তখন ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও ছিলো না, জানতামই না যে বাংলাদেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশের কাগুজে মুদ্রাও হয়! একদিন নানু বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। সৌদি আরব থেকে আমার এক খালু এলেন সেবার। উনাকে বললাম সৌদি আরবের মুদ্রা দিতে। খালু কাগজের কিছু একটা দিলেন। বললাম, 'এটা না, সৌদি আরবের টাকা দেন।' উনি বললেন, 'এটা ১ রিয়াল। সৌদি আরবের টাকাকে রিয়াল বলে।' সেবারই প্রথম বিদেশী কোনো কাগুজে মুদ্রা হাতে পেলাম! সেই থেকে আমার ব্যাংকনোট সংগ্রহের পথচলা শুরু।

ডাকটিকিটের সঙ্গে তখনো পরিচয় হয়নি। একদিন এলাকার সেলুনে চুল কাটতে গিয়ে দেখি, সেখানের আয়নায় দুটো স্টিকার লাগানো। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির ছবিওয়ালা স্টিকার, সঙ্গে India লেখা! বুঝলাম, বিদেশী কোনো স্টিকার! স্বাভাবিকভাবেই ওগুলোর প্রতি আমার আগ্রহ বেশ বেড়ে গেলো! স্টিকারগুলো নিজের কাছে পেতে চাইলাম। সেলুন মালিককে আমার ইচ্ছের কথা জানালে, উনি বললেন যে পরে দেবেন। প্রায় প্রতিদিনই উনার দোকানে উঁকি দিতাম ওই স্টিকারগুলো পাওয়ার লোভে! আমার আগ্রহ দেখে অবশেষে উনি আমাকে স্টিকার দুটো দিয়ে দিলেন। বাসায় এসে আব্বাকে দেখালাম ওগুলো। আব্বা জানালেন যে এ দুটো স্টিকার নয়, ভারতের ডাকটিকিট। আর এগুলোতে যাঁকে দেখা যাচ্ছে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী। এরপর আব্বা আমাকে ডাকটিকিট সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন। উনার কথাগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। তখন থেকেই ডাকটিকিট সংগ্রহের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ বেড়ে গেলো। এখনকার মতো সেসময় হাতে হাতে মোবাইল ছিলো না। চিঠিপত্রের আদান-প্রদানই ছিল যোগাযোগের অন্যতম ভরসা। তখন বিদেশে থাকা লোকজন দেশে প্রচুর চিঠি পাঠাতেন। আমার যেসব আত্মীয়-স্বজন বিদেশে থেকে বাড়িতে চিঠি লিখতেন, তাদের বাড়ির অন্যান্যদের জানিয়ে রাখলাম যে বিদেশ থেকে চিঠি আসলে যেনো ডাকটিকিটগুলো আমার জন্য রেখে দেন। পাশাপাশি এলাকার ডাকঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম। প্রবাস থেকে আসা চিঠিগুলো গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার সময় চিঠির প্রাপকের কাছ থেকে ডাকটিকিটগুলো আমার জন্য চেয়ে রাখতেন উনারা। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর ডাকঘরে গিয়ে কোনো না কোনো ডাকটিকিট নিয়ে আসতাম। এভাবেই শুরু আমার ডাকটিকিট সংগ্রহের গল্প।

মুদ্রা, ব্যাংকনোট, ডাকটিকিট বা সংগ্রহ করা যায় এমন সবকিছুর সঙ্গেই এক মায়াময় ভালোবাসা জড়িত! সংগ্রহীত প্রতিটি বস্তুরই একটি গল্প আছে, যে গল্পগুলো বিভিন্ন যুগ আর ইতিহাসের স্বাক্ষী। সংগ্রহের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও সময়ের মানুষ, পরিবেশ, সভ্যতা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়, এগুলো অনুভব করা যায়! সেই বিশুদ্ধ অনুভূতি শুধুমাত্র প্রকৃত সংগ্রাহকরাই অনুভব করতে পারেন! সংগ্রহ জগতে এসে একটা বিষয় বুঝেছি, ধৈর্য্য-একাগ্রতা-ভালোবাসা না থাকলে সংগ্রহের বস্তু হাতের নাগালে আসে না। তাই সংগ্রহের প্রতি যত্নশীল হওয়াটা অতি আবশ্যক। আমি বিশ্বাস করি, সংগ্রহ বিষয়টা সংগ্রাহকদের রক্তের সঙ্গে মিশে থাকে। 

সেই স্কুল জীবন থেকে সংগ্রহের পথে চলছি। আমার পরিচিতজনেরা সবাই জানেন সংগ্রহের প্রতি আমার ভালোবাসার বিষয়টা। আব্বা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েন-ব্যাংকনোট-ডাকটিকিট এনে আমাকে উপহার দেন। আমার আপন ছোট ভাই দুজন, আমার প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা আমার সংগ্রহে অনেক সহায়তা করেছেন, করছেন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার করে এখন গণমাধ্যমে সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত আছি, কাজ করছি বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গেও। জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছি, দেশ-বিদেশ ঘুরেছি, বদলেছে অনেক কিছু, বদলায়নি শুধু সংগ্রহের প্রতি ভালোবাসা। ছোট্টবেলার সেই মালেয়শিয়ার ১০ সেনের মুদ্রা, সৌদি আরবের ১ রিয়ালের কাগুজে নোট আর ভারতের ডাকটিকিটটা নিয়ে যতটা আগ্রহের সঙ্গে সংগ্রহের পথে পা বাড়িয়েছিলাম, সেই আগ্রহ নিয়ে এখনো মুদ্রা-ব্যাংকনোট-ডাকটিকিট সংগ্রহ করে চলেছি সাধ ও সাধ্যমতো। বর্তমানে আমার সংগ্রহে জাতিসংঘ স্বীকৃত অধিকাংশ স্বাধীন দেশের মুদ্রা, ব্যাংকনোট ও ডাকটিকিট আছে। আছে বিলুপ্ত অনেক দেশের ও বিভিন্ন সময় ব্রিটিশ-ফ্রান্স-পর্তুগিজ শাসিত কিছু অঞ্চলের মুদ্রা-ব্যাংকনোট-ডাকটিকিট। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রচলিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম (ম্যাপ সিরিজ) ব্যাংকনোট রয়েছে আমার সংগ্রহে। শ্রদ্ধেয় বিমান মল্লিক সাহেবের নকশাকৃত বাংলাদেশের প্রথম যে ডাকটিকিটগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলোর এক সেট সংগ্রহ করেছি। এছাড়া বিভিন্ন গভর্ণর ও অর্থসচিব স্বাক্ষরিত বাংলাদেশের নানান সময়ের ব্যাংকনোটও সংগ্রহে রেখেছি। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফোনকার্ড, বাস-ট্রেন-বিমান টিকিট, বোর্ডিং পাস, বিভিন্ন খেলার দর্শক টিকিট, পুরোনো-ঐতিহাসিক দলিলপত্র, রোদচশমা, কলম, মেডেল, টোকেন ও মুদ্রাসদৃশ স্যুভেনির, ম্যাচবক্স-লাইটার ইত্যাদিও সংগ্রহ শুরু করেছি।

সংগ্রহ জগতটা অসীম। সংগ্রাহকদের ধৈর্য্য থাকাটা অনেক বড় গুণ আর সবচেয়ে জরুরি হলো সংগ্রহ সম্পর্কে জানা। প্রতিদিনই সংগ্রহ সম্পর্কিত নানান বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করছি, শিখছি নতুন অনেককিছু। বেশ ভালো লাগছে, উপভোগ করছি। পৃথিবীর ইতিহাসে মুদ্রা-ব্যাংকনোট-ডাকটিকিট বা সংগ্রহীত জিনিসের কোনো শেষ নেই। এক জীবনে সকল কিছু সংগ্রহ করা রীতিমতো অসম্ভব। তবুও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি অবিরত। একজন সাধারণ সংগ্রাহক হিসেবে যতটা সম্ভব সংগ্রহ করবো। খুব ইচ্ছে, ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে হলেও মুদ্রা-ব্যাংকনোট-ডাকটিকিট ও অন্যান্য বস্তু সংগ্রহের একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করবো৷ দেশ-বিদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরবো ভবিষ্যতের সংগ্রাহকদের কাছে।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সকল সংগ্রাহকের পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকুক। সংগ্রাহকদের সংগ্রহের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ হোক পৃথিবীর ইতিহাস।

...
Mohammad Maksudul Hasan Bhuiyan Rahul(SJB:E036)
Mobile : 01711328741

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোহাম্মদ বেলাল হোছাইন ভূঁইয়া
01731 80 80 79
01798 62 56 66

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদক
আল মামুন
01868974512

প্রধান কার্যালয় : লেভেল# ৮বি, ফরচুন শপিং মল, মৌচাক, মালিবাগ, ঢাকা - ১২১৯ | ই-মেইল: news.sorejomin@gmail.com , thana.sorejomin@gmail.com

...

©copyright 2013 All Rights Reserved By সরেজমিনবার্তা

Family LAB Hospital
সর্বশেষ সংবাদ