রাজউকের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বেদখল ! পর্ব-২

news-details
অপরাধ

।।সাইদুল ইসলাম।।
সম্পত্তি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কিন্তু ইজারা দিচ্ছে কাউন্সিলর। বিএনপি আর আওয়ামীলীগ নয় ইজারার বেলায় সবাই সমান। এই নীতিতেই ৩’শ টাকার ষ্ট্যাম্পে দলিল করে ২৪টি প্লট নেতাকর্মীসহ বহিরাগতদের লিজ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কমিশনারের বিরুদ্ধে। তিন পাতার দলিলটি কম্পিউটারে টাইপ করা। তাতে প্লটের ইজারাদারদের নিজ ও পিতার নাম এবং স্ব-স্ব সাক্ষর, দোকান সংখ্যা, ব্যবসার ধরন, ব্যবসায়ীর নাম, মোবাইল নম্বর এবং জামানতের পরিমাণ। এছাড়াও রয়েছে পুলিশ প্রশাসন ও থানা ছাত্রলীগের সভাপতিসহ কোন কোন ব্যক্তিকে প্রতিমাসে কত টাকা দিতে হবে তার অংক। চুক্তির স্থান হিসাবে উল্লেখ করা রয়েছে সেক্টর কল্যাণ সমিতির অফিস।

অভিযোগ রয়েছে, উত্তরার ১১ ও ১৩ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপদ সড়কের দুই পাশে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইদুল ইসলাম সোহেল, সাবেক তিতুমির কলেজ ছাত্রদল নেতা আলী ভূইয়ান, অস্ত্র-নারী ও মাদক ব্যবসায়ী আমিনুল বাপ্পি ও ইউনুস, হরিরামপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পুত্র নাজমূল হাসান ও জাহিদ হাসান, এক নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান হোসেন রিকু, শ্রমিক দল থেকে অনুপ্রবেশকারী শ্রম বিষয়ক সম্পাদক তাজুল ইসলাম জজ, নামধারী যুবলীগ নেতা কবির হাসান, ছাত্রলীগের পশ্চিম থানার সভাপতি বিপুল, সাবেক মেম্বার আবুল হোসেন, উত্তরা পশ্চিম থানা আওয়ামীলীগের স্থগিত কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম প্রিন্স ও নাজমুল করিম বাবু ওরফে গোজা বাবু, জহির, খোকন, হাসান,  কালু, সাজ্জাদকে প্লট গুলো লিজ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিন কমিশনার আফসার উদ্দিন খান, শফিকুল শফিক ও মোহাম্মদ শরিফুর রহমান ।

উল্লেখ্য যে, শ্রমিক দল থেকে অনুপ্রবেশকারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফসার খানের অনুগত তাজুল ইসলাম জজের দখলে রয়েছে ৫ টি প্লট।

রাজউকের বাণিজ্যিক প্লটে অবৈধ দখল ছাড়াও কয়েক কোটি টাকা মূল্যের দু’টি বাণিজ্যিক প্লট হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে কমিশনার আফসার উদ্দিন খান ও শফিকুল শফিকের বিরুদ্ধে। তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি রাজনৈতিক ভাবে হেয় করার জন্যই একটি মহল মিথ্যা রটাচ্ছেন।

তবে দুই বছর পূর্বে (২০১৭ সালের ১১ জুন) “উত্তরায় রাজউকের শত কোটি টাকার সম্পত্তি দখল” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও লেক ভরাট করে প্লট হাতিয়ে নেয়ার কথাটি উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে অবৈধ দখল এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নামও প্রকাশ করা হয়েছিল। তাদের অনেকে এখনো দখলের সাথে জড়িত রয়েছেন।

অন্যদিকে কমিশনার আফসার উদ্দিন খানের হাতিয়ে নেয়া সোনারগাঁও জনপদ সড়কের (সেক্টর ৯) ৬২ নম্বর প্লটটি চাচাতো ভাইয়ের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখানে দুই বছর আগেও কোন প্লট ছিলনা। রাতারাতি উত্তরা লেকের কিছু অংশ ভরাট করে প্লটটি করা হয়েছে। বর্তমানে ইস্পাতের তৈরি একটি ভবনও রয়েছে তাতে ।

অভিযোগ আছে, ঐ সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিউদ্দিন ও সহকারী প্রকৌশলী ফারুক এবং সম্প্রতি বদলি হওয়া রাজউক উত্তরা প্রকল্পের সহকারী পরিচালক (ভূমি-২) সামসুল হক মিল্কি এই কাজে তাকে সাহায্য করেছিলেন।

অন্যদিকে ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপদ সড়কে অবস্থিত ৪৪ নম্বর প্লটটি ৪৯ নং ওয়ার্ডের কমিশনার শফিকুল শফিকের দখলে। এখান থেকে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা ভাড়া তুলে নিচ্ছেন কাউন্সিলর শফিক।

পার্শ্ববর্তী হরিরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তফা বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে প্লটটির ভাড়া তুলতেন। সরকার বদলের পরপরই বিতর্কিত ব্যবসায়ী সোনা সফিক প্লটটির দখল নেন। বাজারটির পাশেই অংশীদারি মালিকানায় জমজম টাওয়ার নামে একটি শপিং মলও রয়েছে তার।

আরও জানা যায়, বহুতল মার্কেট করার পূর্বে স্থানটিতে শতাধিক দোকান ভাড়া দিয়ে কোটি টাকা জামানত নিয়েছিলেন শফিক। কিন্তু দোকান উচ্ছেদের সময় অনেকের জামানতের টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে তার সাথে যোগাযোগ করেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কমিশনার মোহাম্মদ শরিফুর রহমান অভিযোগের বিষয়ে জানান, ফার্নিচার মার্কেটের চাঁদাবাজির সাথে তিনি জড়িত না। বিএনপি জামাত সরকারের আমল থেকেই প্লট গুলো দখলে রয়েছে। তবে আমাদের কাছে তার দখলের সুস্পষ্ট তথ্য প্রমান রয়েছে।

অপরদিকে দখলদার নাজমুল হাসান ও ইউনুস দখলের অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করে জানান, প্লটগুলো তারা ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন ।

স্থানীয় বাস্তুহারালীগ নেতা ফরিদখানের অভিযোগ, নাজমূল হাসান ও তার আপন ভাই জাহিদ হাসান তাকে উচ্ছেদ করে ৮১ ও ৮২ নম্বর  প্লটটি দখল করে ফার্নিচার মার্কেট করেছে। এমনকি প্লটটিতে থাকা বাস্তুহারালীগের অফিসটিও তুলে নেয়ার সময় বেধে দিয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিব হাসানের মতামত জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অপরাধীর কোন দল নেই। দখলদার বা চাঁদাবাজ আওয়ামীলীগের নেতা বা কর্মী হতে পারেনা। চাঁদাবাজ সে যেই হোক সরকার তাকে ছাড় দিবেনা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক আওয়ামীলীগ নেতা দুঃখ প্রকাশ করে জানান, উত্তরায় আওয়ামীলীগের রাজনীতি এখন অর্থের ইশারায় চলে। ত্যাগী নেতা কর্মীরা অবহেলিত। দখলদার, চাঁদাবাজদের কদর বেশি। তাই সামনের দিন গুলোতে বড় পদে তাদেরকেই দেখা যাবে।   

আর সেক্টরে বসবাসকারীদের অভিযোগ, রাতের বেলায় ফার্নিচার মার্কেটগুলো মাদক আর বহিরাগতদের মিলন মেলায় রূপ নেয়। এমন কোন অপকর্ম নেই যা হয়না দখলকৃত প্লটে। দখল টিকিয়ে রাখতে মাঝে মধ্যে অস্ত্র আর লোক সমাগমও ঘটে থাকে। তাই তাদের দাবি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আগেই উচ্ছেদের মাধ্যমে উদ্ধার করা হোক বেদখল হওয়া প্লটগুলো।   

এ বিষয়ে রাজউকের উপ-পরিচালক আশরাফ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রাজউকের সম্পত্তি লিজ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। দলিল করাটাও আইনত অপরাধ। সম্পত্তি যদি বে-দখল বা টাকার বিনিময়ে ভাড়াও দিয়ে থাকে তা আরও বড় অপরাধ।

You can share this post on
Facebook

0 Comments

© 2013 All Rights Reserved By সরজমিনবার্তা