চির অম্লান বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

news-details
সাহিত্য-সংস্কৃতি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া। প্রাকৃতিক বিশাল অপরূপ ক্যানভাসে শিল্পীর রঙ তুলিতে ছবির মত করে দাঁড়িয়ে আছে একটি গ্রাম, যার নাম টুঙ্গিপাড়া। যেখানে নেই শহরের যান্ত্রিকতা, আছে নিঝুম শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ। আছে রাতের আকাশে তারা ভরা। কদম, নিম, নারিকেল, দেবদারু, তাল পাতার ছন্দময় বাতাসের শো শো শব্দ। যেখানে নির্জন দুপুরে ভেসে আসে ডাহুক আর ঘুঘুর ঘু ঘু শব্দ। বাবুই, মাছরাঙ্গা, দোয়েল, ময়না, শালিক আর কোকিলের সুমধুর সূরে মনের জানালা প্রসারিত গান। এমন একটি আদর্শ ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ গ্রাম যার নাম টুঙ্গিপাড়া। গ্রামটি আজ এই জন্য এতটা তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এই গ্রামে জন্মেছিলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। এই গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ বাঙ্গালী জাতি সত্ত্বার অধিকারী ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্ম। এই গ্রামের মেঠো পথ, ধুলো বালি, কাদা পানিতে যার জন্ম তিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন খোকা। খোকা থেকে হয়েছিলেন মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙ্গালী জাতির পিতা। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম করে নিয়েছেন এই মহানায়ক। তিনি রচনা করেণ বাংলার ইতিহাস। রচিত হয় একটি স্বাধীন দেশের। যার নাম বাংলাদেশ। কিভাবে এলো এই নামটি? ইতিহাসের এই মহাকবি ড. মুহম্মদ এনামুল হক, আবুল ফজল প্রমূখ খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবিকে পূর্ব বাংলার একটি নাম ঠিক করার অনু্রােধ করেণ। তারা ঐতিহাসিক দিক বিচার-বিবেচনা করে কেউ বলেন, 'বঙ্গদেশ', কেউ বলেন 'বাংলা', কেউ 'বঙ্গ'। সেই সঙ্গে তারা বলেন, আদি বঙ্গদেশ বলতে পূর্ব বাংলাকেই বুঝায়। ১৯৬৯ এর ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেন- “শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে জনগনের পক্ষ থেকে ঘোষনা করছি- আজ থেকে বাঙালি জাতির এই আবাসভূমির নাম হবে "বাংলাদেশ"।

শত সহস্র সংগ্রাম ত্যাগ ও বিজয়ের মাধ্যমেই যে শুধু এই দেশটি হয়েছে তা নয়, হয়েছে একটি ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ও যুক্তি বিচার বিশ্লেষণে একটি নাম। আর এই নামকরণের প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার কাঙ্খিত সাফল্য ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। এজন্য বাঙ্গালী জাতির গর্ব ও অহঙ্কার টুঙ্গিপাড়ার সন্তান শেখ মুজিব। শেখ মুজিব শুধু একটি নামই নয়, এটি একটি অনূভূতি, প্রেরণা, আদর্শ ও চেতনার নাম। কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন- “বাংলাদেশের আরেক নাম মুজিবল্যান্ড”। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে হৃদয়ে লালন, ধারণ ও মুক্তির জন্য ভাবতেন। “জয় বংলা” এর মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতি মনের শক্তি বৃদ্ধি করতেন। বাংলাকে জয় করার স্বপ্ন ও চেতনা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাই জয় বাংলা শব্দটি বাঙ্গালী জাতির হৃদ স্পন্দন হিসেবে শক্তি, সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন একটি সুখী সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার। আর এই সোনার বাংলাকে ভালবেসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের লেখা আমার সোনার বাংলা কে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭০ সালের পূর্বে ছাত্রলীগ 'জয় বাংলা' স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ "জয় বাংলা' ধ্বনি দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করে। ১৯৭০ সালের ৮ই জুন রেসকোর্স ময়দানে ৬ দফা সংগ্রামের জন্য আহবান জানান। এ জনসভাতেই বঙ্গবন্ধু প্রথম ভাষন শেষে 'জয় বাংলা' উচ্চারণ করেন। এরপর ১৯৭১ সালের ১১ই জানুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর মুখে উচ্চারিত "জয় বাংলা" স্লোগান জনগন গ্রহন করেণ এবং সমগ্র বাংলায় স্লোগানটি ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে এটা হয়ে যায় নির্বাচনের রণধ্বনি। পরবর্তীতে স্বাধীনতার অবিনাশী স্লোগান হিসাবে পরিনত হয়েছে। বাংলা, বাঙ্গালী ও বাংলাদেশের সাথে একত্ত্বা হয়ে আছে বঙ্গবন্ধু। পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার মন্ত্রে জয়বাংলা শব্দটি আজ সর্বজন স্বীকৃত। বাংলাদেশ আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি মধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ আজ ক্ষুধা, নীরক্ষরতা ও স্বাস্থ্য  সেবায় বিভিন্ন সূচকে ইতমধ্যে বিশ্ব দরবারে যায়গা করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ স্বপ্নের সোনার বাংলার পথে। এই মুজিব বর্ষে “জয় বাংলা” শব্দটি ও এর শক্তি হোক প্রতিটি বাঙ্গালীর হৃদয়ের স্পন্দন। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেনঃ ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান। দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

লেখক সৈয়দ নাজমুল হূদা, শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।
 

You can share this post on
Facebook

0 Comments

© 2013 All Rights Reserved By সরেজমিনবার্তা