গাজীপুরে অবৈধ বাজারে বেআইনি ইজারা: প্রশাসনে ধুম্রজাল

news-details
অপরাধ

মো. মেহেদী হাসান, বিশেষ প্রতিবেদক(গাজীপুর):
গাজীপুর নগরীর কোনাবাড়ি বাজার সরকারের অনুকুলে আসার আগেই ইজারা প্রদান করছেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। বাংলা সন অনুসরন করে প্রতি বছরই এই বাজারটি সিটি কর্পোরেশন সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের জারিকৃত “সরকারি হাট-বাজারসমূহরে ব্যবস্থাপনা, ইজারা পদ্ধতি এবং উহা হইতে প্রাপ্ত আয় বন্টন সম্পর্কিত নীতিমালা” অনুযায়ী ক্ষমতাবলে ইজারা প্রদান করে আসছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধান ও গাজীপুর সদরের সহকারী কমিশনার(ভূমি) এর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কোনাবাড়ি স্ট্যান্ডের উত্তর পাশে প্রায় দুই একর ভূমির উপরে সিটির অত্র ৭,৮ দুই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার ‘কোনাবাড়ি বাজার’, যা সম্পূর্ণটাই ব্যক্তি মালিকানা। প্রায় পাঁচশ ভিটি নিয়ে এই বাজারের বর্তমান ইজারাদার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গাজীপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক সেলিম উল্লাহ সরকার।

ইতোমধ্যে স্থাপিত সুনির্দিষ্ট হাট ও বাজারসমূহ অধিগ্রহণ এবং হাট-বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে দেশে বিদ্যমান “হাট ও বাজার(স্থাপন ও অধিগ্রহন) অধ্যাদেশ, ১৯৫৯” অনুযায়ী বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাট ও বাজার স্থাপন করায় নিষেধ রয়েছে। তবে সরকার এবং আইন অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে) হাট ও বাজার স্থাপন করতে পারবেন। একই অধ্যাদেশের ধারা ২(৩) এ বলা হযেছে, আইন লংঘন করে কেউ কোন হাট ও বাজার স্থাপন করলে জেলা প্রশাসক শর্তসাপেক্ষে যে ভূমিতে হাট-বাজার স্থাপন করা হয়েছে তা সহ উহাতে স্থিত সমস্ত স্বার্থ বাজেয়াপ্ত করে সরকারের পক্ষে ভূমির দখল গ্রহণ করবেন।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা মোঃ নুরুজ্জামান মৃধা বলেন, নীতিমালায় সরকারী হাট বাজারের কথা লেখা থাকলেও সিটি কর্পোরেশন চাইলে তার অধিক্ষেত্রে অবস্থিত বেসরকারী হাট বাজারও ইজারা দিতে পারে এবং সারা দেশে তাই হচ্ছে। 

আইন না মেনে গড়ে ওঠা হাট-বাজার নিয়ম অনুযায়ী সরকারের অনুকুলে আসার আগেই সে বাজার কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইজারা দিতে পারে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব(আইন অধিশাখা) হাবিবুর রহমান ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জয়নুল বারী দৈনিক সরেজমিন বার্তাকে জানান, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন। প্রতিবেদককে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস. এম. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) মোহাম্মদ মশিউর রহমান, উপপরিচালক(স্থানীয় সরকার) দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরীসহ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রশ্নের কোন সদুত্তর না দিতে পারলেও গাজীপুর জজ কোর্টের আইনজীবী আসাদুল্লাহ বাদল বলেন, “যে বাজার সরকারের অনুকুলে এসে পেরিফেরিভুক্ত হয়নি, সেই বাজার ইজারা দেওয়া বেআইনি। এটা জন্মের আগে দৌড়ে অংশ নেওয়ার মতো।”

অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সরকারের নিয়ম নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কোনাবাড়ি বাজারের ভিটি মালিক ও ইজারাদার সমন্বয়ে ইজারার খাস আদায়ের নামে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের হাট-বাজার ইজার টোল আদায় চার্ট ঘেটে দেখা যায়, তরকারির ছোট দোকান থেকে দশ টাকা আর বড় দোকান থেকে বিশ টাকা টোল আদায় করার কথা থাকলেও  ছোট দোকান থেকে আদায় করা হয় পঞ্চাশ টাকা আর বড়  দোকান থেকে একশ টাকা। ফলের ছোট দোকান থেকে পনের টাকা আর বড় দোকান থেকে বিশ টাকার টোল আদায়ের কথা থাকলেও টোলের নামে আদায় করা হয় পঞ্চাশ থেকে দুইশ টাকা। ইজারাদার কর্তৃক বাজারের দৃশ্যমান স্থানে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত টোল আদায়ের চার্ট টাঙ্গানোর নিয়ম থাকলেও তা না করে ভিটি মালিকদের সহযোগীতায় ইজারাদার সেলিম উল্যাহর ম্যানেজার মোঃ শফি- মাছ, মাংস, হাঁস, মুরগী, গুর, পান, সুপারী, পেয়াজ, মরিচ, রসুন, আদাসহ সকল প্রকার কৃষি ও অকৃষি পণ্যের দোকানে টোল আদায়ের সরকারী হারের থেকেও প্রায় পাঁচ থেকে দশ গুন বেশি টাকা আদায় করছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী বাজারে উৎপাদিত ময়লা আবর্জনা ইজারাদার নিজ খরচে পরিস্কার করার শর্ত থাকলেও কোনাবাড়ি বাজারে প্রতি দোকানীর কাছ থেকে ময়লা পরিস্কার বাবদ প্রতিদিন ত্রিশ টাকা করে আদায় করেন বাজার কমিটির পক্ষে স্থানীয় মিল্টন।

বাজারে অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে কৌশলে উত্তর এড়িয়ে ইজারাদার সেলিম উল্লাহ সরকার বলেন, কোনাবাড়ি বাজার ইজারা নিয়ে আমি লোকসানে আছি, এরপর আমি আর এই বাজার ইজারা নিব না।

সিটি কর্পোরেশনের বেআইনি ইজারার ব্যাপারে প্রশাসনের ধুম্রজালে সচেতন মহলে চলছে সমালোচনা। অনেকেই মনে করছেন সিটি কর্পোরেশনের বেআইনি কার্যক্রমের ব্যাপারে মন্তব্য করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এরাতেই চুপ রয়েছেন জেলা প্রশাসন। কোনাবাড়ি বাজারে বেআইনি ইজারা ও ইজারার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে কিনা সে নিয়েও সন্দেহ রয়েছে জনমনে।

পেরিফেরির বাইরের বাজার থেকে যে অর্থ আদায় করা হচ্ছে সে ব্যাপারে অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদল বলেন, অবৈধ বাজার থেকে যে অর্থ নেয়া হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বেআইনি, এটা জনকল্যানে ব্যয় করা উচিৎ। আর এই অর্থ আদায় বা বেআইনি কার্যক্রম বন্ধে চাইলেই পুলিশ কিংবা প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। একই সাথে এই বাজারটিকে সরকারের অনুকুলে পেরিফেরিভুক্ত করাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিৎ।

You can share this post on
Facebook

0 Comments

© 2013 All Rights Reserved By সরেজমিনবার্তা