শিকড়ের টানে প্রত্যাবর্তন

news-details
সাহিত্য-সংস্কৃতি

শত সহস্র সংগ্রাম, ত্যাগ আর তিতীক্ষার নাম বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী পাকিস্তানী হানাদার ও শাসক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত লাল সবুজের পতাকা ও স্বাধীণ ভূখন্ড। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ভেজা ও দুই লক্ষ মা বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বপ্নের সোনার বাংলা। শেখ মুজিব শুধু একটি নামই নয়, এটি একটি অনুভূতি, স্বপ্ন, প্রেরণা ও আদর্শ। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ৮ই জানুয়ারী ১৯৭২ সাল সকাল সাড়ে ছয়টায় লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পিআইএ এর বিমানটি। সেখান থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রাজকীয় কমেট বিমানে ৯ই জানুয়ারী সকালে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাত্রাপথে বিমানে তেল নেয়ার জন্য সাইপ্রাসে যাত্রাবিরতি করলে, সাইপ্রাস রাষ্ট্রপতি ম্যাকারিয়াস বঙ্গবন্ধুকে ফুলেল স্বাগত জানান।

১০ই জানুয়ারী ১৯৭২, সকালে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করেন। সকাল ০৮ টা বেজে ১০ মিনিট। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রূপালী কমেট বিমান ধীরে ধীরে এসে সশব্দে সুস্থির। তারপর শব্দহীন পিনপতন নিরবতা। সিঁড়ি লাগলো। খুলে গেলো দার । দাঁড়িয়ে আছে সহাস্য, সুদর্শন, দীর্ঘকায়, ঋজু, নবীন দেশের রাষ্ট্রপতি। অকস্মাৎ এক নির্বাক জনতার ভাষাহীন জোয়ারের মুখো মুখি। সুউচ্চ কন্ঠে উচ্চারণ করলেন তিনি আবেগের বাঁধভাঙ্গা দুটি শব্দ, “জয় বাংলা”। করতালি, উল্লাস, আলিঙ্গন আবেগের অশ্রুতে ঝাপসা স্মৃতি। রাষ্ট্রপতি ভি.ভি. গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের মন্ত্রী সভার সদস্যবৃন্দ, কূটনীতিবিদ, শত শত সাংবাদিক। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, টেলিভিশন। অদূরে ক্যান্টনমেন্ট এর জনবহুল জনসভা। আন্তরিক অভ্যর্থনায় রাস্তার দুপাশে লাখো জনতা। রাষ্ট্রপতি ভবন। ঝাপসা স্মৃতিতে আবার ভেসে আসে পালাম বিমানবন্দর। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী সেই দিনের বর্ণনা করেছেন। একুশ বার তোপধ্বনি আর লাখো মানুশে ষ র আনন্দের উল্লাসের মধ্য দিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছায় নবীন দেশের্ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেয়া হলো। বাংলাদেশ এর স্বাধীণতা যুদ্ধে বাংলাদেশ এর জনগণ ও স্বাধীণ বাংলাদেশ এর বিপ্লবী সরকারের প্রতি ভারতের সর্বাত্মক সমর্থনের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন “তারা বাংলাদেশ এর প্রায় এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। রণাঙ্গণে ভারতের হাজার হাজার সৈন্য প্রান দিয়েছে, হাজার হাজার সৈন্য আহত হয়েছে, জীবনের অনেক কিছু হারিয়েছে।

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন “স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বহু দেশের নেতাদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছেন এবং অনেক দেশের নেতাদের টেলিগ্রামের মাধ্যমে অনুরোধ করেছেন আমার মুক্তির জন্য পাকিস্তান সামরিক জান্তার উপর চাপ সৃষ্টি করতে”। ভারতের জনগণ ও সরকার কে ধণ্যবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন “ভারত হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। আমাদের বুন্ধুত্ব অটুট থাকবে। কৃতজ্ঞতার কোনো ভাষা আমার নেই”। এভাবেই একশো পঞ্চাশ সদস্যের গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচ মিনিট ভাষন দেন। সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান কে চিন্তিত ও ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। তার ছয় ফুট দীর্ঘ দেহ ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। কারাগারে থেকে চল্লিশ পাউন্ড ওজন বা এরো বেশী ওজন হ্রাস পেয়েছে। এদিকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে সারা ঢাকার মানুষের মধ্যে আনন্দের বাঁধ ফাটা উচ্ছাস উল্লাস । দলে দলে হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমে আসে, ছেলে বুড়ো , কিশোর কিশোরী, যুবক যুবতী, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে শেখ মুজিব ও জয় বাংলা স্লোগানে, ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড , জাতীয় পতাকা হাতে তেঁজগাও বিমানবন্দর থেকে রেইস কোর্স ময়দান পর্যন্ত মিছিলে মিছিলে বাজি পুড়িয়ে আনন্দ উৎসব চলছে।  পদ্মা, মেঘনা, ও যমুনার ঢেউ এর মতো, মানুশের ঢল ও শব্দে আছড়ে পড়ছে সারা ঢাকা শহর। বিকাল তিন ঘটিকায় বিমানবন্দরে ফুলেল শুভেচ্ছায় নবীন দেশের্ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে  বরণ করে নেয়া হলো স্বাধীণ বাংলার মাটিতে। হুইল চেয়ারে বসে বিমান বন্দরে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। মাথা ঝুঁকে হাত নেড়ে বঙ্গবন্ধু তার পিতাকে সালাম জানান। 

বিমানবন্দর থেকে খোলা ট্রাকে চড়ে রেইসকোর্স ময়দানে এসে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু বলেন “ আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, নেতা হিসেবে নয়, আপনাদের ভাই হিসেবে বলছি, যদি দেশবাসী, খাবার না পায়, যুবকরা চাকুরী বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা, ব্যর্থ হবে, পুণ্য হবে না। তোমরা আমার ভাইয়েরা গেরিলা হয়েছিলে দেশমাতার মুক্তির জন্য, তোমরা রক্ত দিয়েছো, তোমাদের রক্ত বৃথা যাবে না। বাংলাদেশ আজ মুক্ত স্বাধীণ। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র । বাংলাদেশ হবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা, পাশাপাশি স্বাধীণতা অর্জনে অংশগ্রহণকারী সকল শ্রেণীর জনতাকে আমি পরম কৃতজ্ঞতার সাথে সালাম জানাই”। রেইসকোর্স ময়দানে জনসভা শেষে বঙ্গবন্ধু তার পরিবারের সাথে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতরণ হয়। সকলে ফুলের পাপড়ি বর্ষণে ব্যস্ত, তখন তিনি তার দুই কন্যাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরেন। তার পর নব্বই বছর বয়ষ্ক পিতার সামনে হাটু গেড়ে বসেন এবং কদমবুচি করেন। অন্য ঘরে যেয়ে আশি বছর বয়ষ্কা মা কে বুকের মধ্যে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বলেন “ আমি যেয়ে বাগিয়ার নদীতে ছাতা মাথায় মাছ ধরবো”। তোমরা একটি স্বাধীণ দেশে বসবাস করছো এরপর আমার তোমাদের আর কিছু দেয়ার নেই। আমি জীবনে দীর্ঘ এগারো টি বছর জেলে খেটে আমার পুত্র কন্যাকে অবহেলা করে নিজের ঘর সংসার বাদ দিয়ে দেশের কাজ করেছি”।

হে বীর, তুমি ত্যাগী, তুমি মহান, তুমি উদার,তুমি মানবিকতায় শ্রেষ্ঠ । ত্যাগ করেছ বলেই আজ আমরা স্বাধীণ দেশে মাথা তুলে সোনার বাংলা গাইতে পারি। পরাধীণতার শৃঙ্খল থেকে আমাদের তুমি মুক্তি দিয়েছো। তলাবিহীন সোনার বাংলা থেকে আজ সত্যিকারের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছে তোমার দেশ। আজ তোমার সোনার বাংলা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে স্থান করে নিয়েছে।  তোমার স্বপ্ন, তোমার দেখানো পথে তোমার আদরের কন্যা, তোমার হাসু আজ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মানচিত্র পরিচিত করেছে। তুমি বীর বেশে এসেছিলে বলেই জননী জন্মভুমি স্বার্থক হয়েছে। সারাবিশ্বে তোমার লাল সবুজের পতাকা উড়ে। দামাল ছেলেরা আজ বিশ্বকাপে খেলে। তোমার জয় বাংলা শব্দটি আজ অবিনাসী স্লোগান হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। হে পিতা, তোমার ভালোবাসা ত্যাগ ও কান্না আমরা বৃথা হতে দিবো না। আজ এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে এই হোক মোদের দীপ্তযাত্রা। 

সৈয়দ নাজমুল হুদা,
শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর 

You can share this post on
Facebook

0 Comments

© 2013 All Rights Reserved By সরেজমিনবার্তা