অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কাল হলো ইংল্যান্ডের

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কাল হলো ইংল্যান্ডের

একটি ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হবে আর ইংল্যান্ড দল নিয়ে মেতে উঠবে না ইংলিশ মিডিয়া, এটা যেন স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কেমন করবে, সেটা পরের বিষয়। কিন্তু শুরুর আগেই ইংলিশ মিডিয়া এতটাই মেতে ওঠে যে, বিশ্বকাপের খেলা মাঠে না গড়িয়ে ইংলিশ অধিনায়কের হাতে তুলে দিলেই যেন সবচেয়ে ভালো করবে ফিফা।

অথচ এবার অদ্ভূতভাবে ইংলিশ মিডিয়া চুপচাপ। নিজেদের দল নিয়ে কোনো মাতামাতি নেই। উত্তেজনা, উচ্ছাসের বিন্দুমাত্র ছিল না। বিশ্বকাপে নিজেদের ফুটবল দলের চেয়ে বরং, ইংলিশ মিডিয়ায় মাতামাতি ছিল রাশিয়ার সঙ্গে কুটনৈতিক বিষয় নিয়ে। রাশিয়ার সাবেক দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নার্ভ এজেন্ট গ্যাস হামলায় ইংল্যান্ডে হত্যা করার প্রতিবাদে কুটনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল রাশিয়া এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে। ব্রিটিশ মিডিয়া সেই কুটনৈতিক যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢালার কাজটাই করেছিল সবচেয়ে বেশি।

ইংল্যান্ড নিয়ে খোদ ইংলিশ মিডিয়ার ‘অতি আগ্রহী’ হয়ে না ওঠার মূল কারণই হলো, তাদের দলের এবারের অবস্থা। গ্যারেথ সাউথগেট যে দলটিকে বাছাই করেছিলেন রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য, সেই দলটির ওপর আস্থা ছিল না কারো। ইংল্যান্ড সমর্থকদের তো না’ই। সুতরাং, ইংলিশ মিডিয়ার আগ্রহ তৈরি হবে কিভাবে?

প্রতিটি বিশ্বকাপের আগে যেভাবে ইংলিশদের ‘সোনালি প্রজন্ম’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতো, এবার তেমনটি ছিল না। কারণ, এই দলটিতে একা এক হ্যারি কেইনকে ছাড়া আর কেই’বা এতটা পরিচিত ফুটবলার ছিলেন? কে ফুটবল বিশ্বের সব আলো নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন রাশিয়া বিশ্বকাপে! ব্রিটিশ সমর্থকরা তো সাউথগেটের এই দলটিকে ‘কচিকাচার আসর’ বলেও অভিহিত করেছিল।

বিশ্বকাপের আগে ফেবারিটের যে তালিকা তৈরি হয় নানা মুনির নানা কথা এবং লেখায়- সেখানে এবার রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে কেউ সাহস করেনি তাদের তালিকায় ইংল্যান্ডের নামটি রাখার। এমনকি এবার বিশ্বকাপের ব্ল্যাক হর্স হিসেবেও নাম লেখাতে পারেনি ইংল্যান্ড। বাজিকররা মোটেও ইংলিশদের নামে বাজি ধরতে পারেনি।

কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে ইংলিশদের নিয়ে করা সব ধারণা। দলটি প্রথম পর্বে পড়েছিল, গ্রুপ ‘জি’তে। সেখানে আরেক শক্তিশালী দল বেলজিয়াম। প্রথম ম্যাচেই তিউনিসিয়ার মুখোমুখি। এই ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েণ্ট হারানোর মুহূর্তে হ্যারি কেইনের গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংলিশরা। কেইন করলেন জোড়া গোল।

পরের ম্যাচ বিশ্বকাপে নবাগত পানামার বিপক্ষে। এবার কেইন করলেন হ্যাটট্রিক। ইংল্যান্ড করলো ৬ গোল। ৬-১ ব্যবধানে জিতে দ্বিতীয় ম্যাচেই নাম লেখায় তারা রাউন্ড অব সিক্সটিনে। পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটতে থাকা একটি দলে পরিণত হলো ইংলিশরা। ব্রিটিশ মিডিয়াও এবার গা ঝাড়া উঠলো। সময় হলো তাদেরও মেতে ওঠার। ব্রিটিশ মিডিয়ায় তখন থেকেই ঢোলের বাদ্য বাজতে শুরু হয়, কেইনের হাত ধরেই এবার বিশ্বকাপ জিতবে তারা।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোতে যেভাবে সমীকরণ তৈরি হয়, তাতে ইংল্যান্ডের ম্যাচ শেষের দিকে হওয়ার কারণে হিসাব মেলানো সহজ হয়ে যায় তাদের জন্য। যে কারণে, বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে দেখা গেলো, ইংলিশরা নিয়মিত একাদশের ৯জনকে বসিয়ে রেখে দল মাঠে নামালো। অবধারিতভাবেই হার। ১-০ গোলে হেরে গ্রুপ রানারআপ হয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলো ইংল্যান্ড।

হিসেবটা তারা এমনভাবে করলো, যাতে অন্তত সেমিফাইনাল পর্যন্ত তাদের বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়তে হয়। ওই সময় ইংল্যান্ডের হিসাব ছিল, সেমিতে তারা মুখোমুখি হবে স্পেনের; কিন্তু স্বাগতিক রাশিয়া যেন তাদের জন্য আশির্বাদ হয়েই দেখা দিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে রাশিয়া টাইব্রেকারে বিদায় করে দিল শক্তিশালী স্পেনকে।

ইংলিশ মিডিয়ায় এবার কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের তুমুল বন্দনা। বিশ্বসেরা কোচ, বিশ্বসেরা ট্যাকটিসিয়ান- কত কি নামে তাকে অভিহিত করা শুরু করলো। বিশ্বকাপ তো শুধু মাঠের খেলা নয়, মস্তিষ্কের কৌশলও। সেই কৌশলে সাউথগেট ইংল্যান্ডের জন্য এমন রাস্তা তৈরি করলেন, তাতে তারা যেন সোজা ফাইনালটা দেখতে পাচ্ছিল। এমনকি উজ্জিবিত ইংলিশদের হাতে ১৫ জুলাই বিশ্বকাপের ট্রফিটাও লিখে দিচ্ছিল ইংলিশ মিডিয়া।

পরিকল্পনামতই এগিয়ে এলো ইংল্যান্ড। দ্বিতীয় রাউন্ডে কলম্বিয়ার সামনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখোমুখি হয়েছিল তারা। যদিও টাইব্রেকারে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ম্যাচ জিতে কোয়ার্টারে উঠে যায় ইংলিশরা। প্রত্যাশার বেলুন তাদের আরও ফুলে ওঠে তাদের। কোয়ার্টার ফাইনালে অনায়াসে হারালো সুইডেনকে। বেলুন ফোলানো আরও বেড়ে গেলো। ২৮ বছর পর কোনো একটি দল সেমিফাইনালে উঠলে, প্রত্যাশার বেলুন ফোলানোটাই স্বাভাবিক।

সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি ইংল্যান্ড। ইংলিশ মিডিয়ার তো এবার আকাশে ওড়া শুরু হলো। সারা বিশ্ব মাত করে দিতে শুরু করলো, ক্রোয়েশিয়া তো আর কিছুই নয়। সেমিতে ইংল্যান্ডের সামনে স্রেফ উড়ে যাবে। ক্রোয়েশিয়াকে আমলেই নিচ্ছিল না ইংল্যান্ড। সৌজন্যতা বশতঃ খেলোয়াড় এবং কোচ হয়তো মুখে বলেছেন, ক্রোয়েশিয়াও শক্তিশালী। তাদেরকে সমীহ করছেন।

কিন্তু ইংলিশ মিডিয়া কিংবা ইংলিশ ফুটবলার ও টিম ম্যানেজমেন্টের জানা থাকা প্রয়োজন ছিল, ক্রোয়েশিয়া গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ডেনমার্ক এবং কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হারিয়েছে রাশিয়াকে। তবুও, ইংলিশরা যে ক্রোয়েশিয়াকে মোটেও মূল্য দেয়নি সেটা তাদের খেলায় বোঝা গিয়েছিল। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ইংলিশদের শরীরি ভাষা জানা দিয়েছিল তাদের জাত্যাভিমানের।

তারওপর, ম্যাচের ৫ম মিনিটেই কেইরান ট্রিপারের দুর্দান্ত এক ফ্রি কিকে গোল পেয়ে যেন আরও উড়তে শুরু করেছিল। ওই এক গোলেই ইংলিশরা ভেবেছিল, তারা ফাইনালে পৌঁছে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্মম সত্যেরই মুখোমুখি হতে হলো জাত্যাভিমানি ব্রিটিশদের। শেষ মুহূর্তে মারিও মানজুকিচের অসাধারণ গোলে বিদায় ঘণ্টা বেজে যায় ইংল্যান্ডের।

ক্রোয়েশিয়ান দলের প্রাণভোমরা লুকা মদ্রিচ কিন্তু ব্রিটিশ মিডিয়ায় তাদের নিয়ে করা সব সমালোচনা ম্যাচের আগ পর্যন্ত সহ্য করেছেন। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যাওয়ার পর মদ্রিচ খুব কড়া ভাষায় ইংল্যান্ডের ফুটবলবোদ্ধা এবং মিডিয়ার সমালোচনা করলেন। ব্রিটিশ মিডিয়া দাবি করেছিল ক্রোয়েশিয়ানরা ক্লান্ত। তাদের দৌড় নাকি কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

মদ্রিচ সমালোচনা করলেন। বললেন, ‘তাদের সাংবাদিক এবং বোদ্ধারা আমাদেরকে গোনায়ও ধরেনি। তারা বলেছিল আমরা ক্লান্ত। আমরা নাকি মৃতের মত হাঁটি। কিন্তু তাদের জানা থাকা দরকার, সেমিফাইনাল ম্যাচে কারও ক্লান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আপনার জানা থাকা দরকার, কি করতে হবে এই ম্যাচে। আর্জেন্টিনার ম্যাচ বাদে এটাই ছিল আমাদের সেরা ম্যাচ। তাদের আক্রমণাত্মক শব্দগুলোই তাদেরকে ভুল প্রমাণিত করলো। তাদের উচিৎ প্রতিপক্ষকে আরও সম্মান করা।’

মদ্রিচের কথাতেই বোঝা যাচ্ছে, ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের আগে কতটা আত্মবিশ্বাসী ছিল ইংল্যান্ড। তাদের কথা, শরীরি ভাষা, আচরণ- সর্বক্ষেত্রেই সেই আত্মবিশ্বাসের চাপ ফুটে উঠেছিল। ববি মুরের ছবির জায়গায় কেইনকে বসিয়ে তার হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি ধরিয়ে দেয়াই এটা প্রমাণ করে। ক্রোয়াটদের বিপক্ষে যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ফুটছিল ইংলিশরা, শেষ পর্যন্ত সেটাই কাল হলো তাদের।

Comments are closed.

More News...

Fatal error: Call to undefined function tie_post_class() in /var/sites/s/sorejominbarta.com/public_html/wp-content/themes/bdsangbad_magazine_themes/includes/more-news.php on line 40