জেল থেকে হেলিকপ্টারে পালালো লোমহর্ষক ঘটনা

জেল থেকে হেলিকপ্টারে পালালো লোমহর্ষক ঘটনা

প্যারিসের সুরক্ষিত একটি জেলখানা থেকে দুর্ধর্ষ ফরাসী অপরাধী রেদোয়ান ফেইদ হেলিকপ্টার দিয়ে গত সপ্তাহে কীভাবে পালিয়ে যেতে পারলেন সেটা নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনার মধ্যে ফ্রান্সের পুলিশ বলছে, ফেইদের চার থেকে পাঁচজন ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্ত বন্ধুর কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।

ফ্রান্সে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার কয়েকদিন পরেও এবিষয়ে নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। তাতে দেখা যাচ্ছে যে হামলাকারীরা হেলিকপ্টারে করে এসে, তাদের কাঙ্খিত ব্যক্তিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার আগে, জেলখানার পরিদর্শন কক্ষ পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল।

ফরাসী পুলিশ সতর্ক করে দিয়েছে, “তার এসব ক্যারিশমা এবং লোক-কাহিনীর পেছনে আছে বিপদজনক এক ব্যক্তি।”

এই ঘটনার পর ফ্রান্সের আইন ও বিচারমন্ত্রীর পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে। জবাবে তিনি বলেছেন, আগামী অক্টোবর মাস থেকে ফরাসী জেলগুলোতে মোবাইল ফোন পুরোপুরি জ্যাম করে দেওয়া হবে।

এর আগে ফেইদ নিজেকে গ্যাংস্টার সিনেমার বড় ধরনের ভক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, এসব মুভি থেকে অনেক কিছু শিখেছেন তিনি।

একবার ফরাসী ম্যাগাজিন পয়েন্টকে তিনি বলেছিলেন, ১৯৯৫ সালে তিনি হিট নামেরএকটি ছবি হলে গিয়ে সাতবার দেখেছিলেন। আর ডিভিডিতে দেখেছেন একশোবারেরও বেশি। তিনি জানিয়েছেন, সশস্ত্র একটি গাড়ি দিয়ে কিভাবে ডাকাতি করা হলো সেটার বিস্তারিত দেখতেই এই ছবিটি তিনি এতোবার দেখেছিলেন।

জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই রেদোয়ান ফেইদের খোঁজে সারা দেশে হাজার হাজার পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তার টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফরাসী পুলিশ বলছে, তারা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাকে খুঁজছেন। তবে এটাও স্বীকার করেছেন যে ফেইদ পালিয়ে ফ্রান্সের বাইরেও চলে যেতে পারে।

রেদোয়ান ফেইদ। ২০১০ সালে তোলা ছবি।

রেদোয়ান ফেইদের সহযোগী বন্ধুদের সম্পর্কে, যারা হেলিকপ্টার নিয়ে জেলখানার ভেতরে অবতরণ করে, তাকে তুলে নিয়ে পালিয়ে গেল, তাদের সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় নি- একথা বলছেন ফরাসী পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারাই।

অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ফিলিপে ভেরনি বলেছেন, “আমাদের প্রাথমিক ধারণা যে এই কমান্ডো দলটিতে চার থেকে পাঁচজন লোক ছিলো। তাদের সবাই অজ্ঞাত। অবশ্যই সবাই পলাতক। সম্ভবত তারা ফেইদের ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্ত বন্ধু, যারা এর পরিণতির কথা চিন্তা করেও এতো বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে পারে।”

কীভাবে ঘটলো এই ঘটনা?

রবিবার সকাল বেলা। দুই ব্যক্তি হেলিকপ্টার চালানো শিখতে গিয়েছিলেন ফন্টেনে-ত্রেসিনি ফ্লাইং ক্লাবে। ধারণা করা হচ্ছিল তাদের একজন পিতা আর অন্যজন পুত্র। তাদের বয়স ৫০ ও ২০ এর ঘরে।

হেলিকপ্টারের পাইলট স্টেফানি বে ফরাসী সংবাদ মাধ্যম আর টি এলকে বলেছেন, এর আগেও তাদের সাথে তার একবার কি দুবার দেখা হয়েছিল। কিন্তু রোববার তার মনে হয়েছে যে তারা তার ও বিমান সম্পর্কে অনেক বেশি কিছু জানে, তারা তার কাছে বিশেষ একটি হেলিকপ্টার চেয়েছিলেন।

তিনি তাদেরকে ওই হেলিপ্টার দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাদেরকে বলেন, নতুন যারা শিখছে তাদের জন্যে সেটা উপযোগী নয়। কিন্তু তারপর তাকে ও তার পরিবারকে জিম্মি করা হয়, বলেন তিনি।

পরে ওই হেলিকপ্টারটি নিয়ে যাওয়া হয় একটি মাঠের দিকে। সেখান থেকে তোলা হয় তৃতীয় সহযোগীকে। বন্দুকের মুখে তাকে এসব করতে বাধ্য করা হচ্ছিল বলে তিনি জানান।

সুদ-ফ্রাসিলিয়েন কারাগারের পরিদর্শন কক্ষে ছিলেন ফেইদ, যখন হেলিকপ্টারটি সেখানে অবতরণ করে। ফেইদের সাথে তার ভাইও ছিল।

কেউ যাতে হেলিকপ্টার নিয়ে ভেতরে যেতে না পারে সেজন্যে জেলখানাটি কোন নেট দিয়ে ঢাকা ছিল না।

দুপুরের ঠিক কিছু আগে ফেইদের সহযোগীরা অ্যাঙ্গেল গ্রাইন্ডার দিয়ে দরজা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় তারা ব্যবহার করে স্মোক বোমাও। আর অন্যরা তখন হেলিপ্টার ও তার চালককে বাইরে পাহারা দিচ্ছিল।

তারপর রেদোঢান ফেইদকে হেলিকপ্টারে তুলে তারা উড়ে যায় আকাশে। এক সময় চলে যায় গনেসে এলাকার দিকে। সেখানে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল একটা গাড়ি। হেলিকপ্টারটিকে ফেলে তারা সেখান থেকে ওই গাড়িতে বরে পালিয়ে যায়।

পরে ওই হেলিপ্টারটিকে পুলিশ খুঁজে পায় অগ্নিদগ্ধ অবস্থায়। তারা যে শাদা গাড়িতে করে পালিয়ে গিয়েছিল পুলিশ সেই গাড়িটিকেও পরে প্যারিসের উত্তরে পুড়ে যাওয়া অবস্থায় খুঁজে পায়।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ধারণা করছেন এরকম একটি অপারেশনের আগে ফেইদের সহযোগীরা ড্রোনের সাহায্যে জেলখানার উপর থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে।

রেদোয়ান ফেইদ প্রথম কোন অপরাধী নন যিনি হেলিকপ্টারে করে জেল থেকে পালিয়েছেন। আর আগে সাজাপ্রাপ্ত খুনী প্যাসকাল পায়েতও দুবার এই একই পদ্ধতিতে কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

তবে গত রোববারের ঘটনার পর ফরাসী কারাগারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে।

কে এই ফেইদ?

ফেইদের বয়স ৪৬। হলিউডের অপরাধ ধর্মী সিনেমার পোকা তিনি। বলেছেন, এসব সিনেমা থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন।

একবার তিনি হিট সিনেমার নির্মাতা মাইকেল ম্যানের সাথে প্যারিসের একটি চলচ্চিত্র উৎসবে দেখা করে তাকে বলেছিলেন: “আপনি আমার কারিগরি উপদেষ্টা।”

এর আগেও ফেইদ জেল থেকে পালিয়েছেন। বোমা ফাটিয়ে পাঁচটি দরজা ভেঙে জেল থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২০১৩ সালেও। সেসময় তিনি কারারক্ষীদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

আরো একটি কারণে তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেন। সেটি হলো তার লেখা একটি বই। প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৯ সালে। সেখানে তিনি লিখেছেন প্যারিসের রাস্তায় কীভাবে বড় হয়েছেন তিনি এবং একসময় তিনি কেমন করে অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

তখন ফরাসী পুলিশের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেন ‘একজন লেখক’ হিসেবে। সূত্র: বিবিসি।

Comments are closed.

More News...

Fatal error: Call to undefined function tie_post_class() in /var/sites/s/sorejominbarta.com/public_html/wp-content/themes/bdsangbad_magazine_themes/includes/more-news.php on line 40