স্বামীর লাশ না পাবার কষ্টে যুক্ত হয়েছে অভাব

স্বামীর লাশ না পাবার কষ্টে যুক্ত হয়েছে অভাব

সাইফুল ইসলাম চৌকিদার, ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর পাচক। বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়ায়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় দেশি-বিদেশিসহ ২২ নাগরিক নিহত হন। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে সাইফুলেরও মৃত্যু হয়।

গুলশান হামলাকারীদের সঙ্গে লাশ মেলায় সাইফুলের গায়েও লেগে গিয়েছিল ‘জঙ্গি তকমা’। পরে স্বজনেরা তাকে বেকারির পাচক হিসেবে সনাক্ত করলেও লাশ আর ফেরত পায়নি।

জঙ্গি হামলার ঘটনার পর কেটে গেছে দুই বছর। সাইফুলের ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার জন্য হলি আর্টিজান কর্তৃপক্ষ কিছু অর্থের যোগান দিচ্ছে। কিন্তু, সরকারের পক্ষ থেকে মেলেনি কোনো সহায়তা।

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামে তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া আক্তারের (২৮) এখন দিন কাটছে খেয়ে-না খেয়ে। সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

এই দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সামিয়া (১১) পঞ্চম শ্রেণি ও ছোট মেয়ে ইমলী (৯) তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। আর সাইফুল নিহতের ৩ মাস পর ভূমিষ্ঠ হয় একমাত্র ছেলে হাসান।

সে এখন হাঁটতে শিখেছে, দিনভর কথার খৈ ফোটায়। বাবা বাবা বলে ডাকে। বাড়ির অন্য শিশুরা তাদের বাবার কোলে গেলে ২১ মাস বয়সী হাসানও তার বাবার ছবি বুকে নেয়, বলে, ‘আমার বাবা অফিসে, ঢাকা থেকে বাড়ি আসবে।’

ছেলের মুখের ভাঙ্গা ভাঙ্গা এই উচ্চারণই মায়ের বুক ভেঙে দেয়। কিন্তু, তিনি অবুঝ সন্তানকে বলতে পারেন না, তার বাবা আর কোনো দিনই আসবে না।

অবশ্য সাইফুলের মেয়ে দুটি জেনে গেছে, তাদের বাবা আর বেঁচে নেই। কোনো ডাকেই ফিরে আসবে না, আদর-সোহাগ দেবে না। অন্য বাবাদের মতো স্কুলে নিয়ে যাবে না।

ছেলের শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ মা। প্রায়ই বাড়িতে ছেলের জন্য বিলাপ করেন। এতো শোকের মধ্যেও থেমে নেই জীবন।

তিন শিশু সন্তানের জন্য নিরন্তর লড়াই করছেন সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার। তিনি আর পেছনে তাকাতে চান না। সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সাইফুলের বিষয়ে জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সোনিয়া। বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পৌরসভার মেয়র সার্টিফিকেট দেয়ার পরেও সাইফুলের লাশটা আমাদের দেয়া হয়নি। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে জঙ্গিদের সঙ্গে দাফন করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার অবুঝ ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার পর তার বাবার কবরটাও দেখতে পাবে না। এর চাইতে আর কষ্টের কি হতে পারে?’

নিহত সাইফুলের পরিবার ও তার স্বজনেরা জানান, সাইফুল ইসলাম শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের মৃত আবুল হাসেম চৌকিদারের ৫ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। দীর্ঘ ১০ বছর জার্মানিতে থাকার পরে দেশে ফেরেন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গি হামলার মাত্র দেড় বছর আগে সাইফুল হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় পিৎজা তৈরির পাচক হিসেবে যোগ দেন।

আর্টিজানে হামলায় নিহত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাইফুলকেও জঙ্গি বলে চিহ্নিত করে। তদন্তকালে সাইফুলের মা সমেরা বেগমকে ছেলের লাশ সনাক্তের জন্য ঢাকায় নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করা হয়।

এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্নেল শওকত আলী ও নড়িয়া থানা থেকেও সাইফুলের জন্য প্রত্যয়ন দেয়া হয়। তিন মাস তদন্ত শেষে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে সাইফুলের লাশ নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে দাফন করা হয়।

সাইফুলের তিন শিশু সন্তান নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী সোনিয়া আক্তার। স্বামীর বেশ আগেই বাবাও মারা গেছেন। ফলে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো এখন কেউ নেই।

শিশু সন্তানদের নিয়ে অর্ধহার-অনাহারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন সোনিয়া। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা মেলেনি। তাদের কেউ কোনো খোঁজ-খবরও নেয়নি।

স্বামীর প্রসঙ্গ আসতেই সোনিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঘটনার দিন (২০১৬ সালের ১ জুলাই) বিকেলে তার (সাইফুল) সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছিল। এরপর আমার জীবনে এমন দুঃসংবাদ আসবে আমি ভাবতেও পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর তিন মাস পর আমার ছেলে হাসান ভূমিষ্ট হয়। সে এখন বাবা বাবা বলে ডাকতে শিখেছে। ওর ভাঙ্গা ভাঙ্গা উচ্চারণে বাবা ডাক শুনলে আমি স্থির থাকতে পারি না।’

সূত্র : পরিবর্তন

Comments are closed.

More News...

Fatal error: Call to undefined function tie_post_class() in /var/sites/s/sorejominbarta.com/public_html/wp-content/themes/bdsangbad_magazine_themes/includes/more-news.php on line 40