জটিল ফাঁদে এলএনজি : দৈনিক লোকসান ৩৩ লাখ টাকা

জটিল ফাঁদে এলএনজি : দৈনিক লোকসান ৩৩ লাখ টাকা

ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ শুরু না হতেই দেখা দিয়েছে একের পর এক জটিলতা। সামগ্রিকভাবে সমন্বয়ের অভাব ও অব্যস্থাপনার কারণে পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহের তারিখ পিছিয়ে গেছে এ যাবত তিন দফায়। তবে কারিগরি বা যান্ত্রিক ত্রুটি কেটে গেলে জুন মাসের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ শুরু হতে পারে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, সমুদ্রের তলদেশে পাইপলাইনে ফুটো দেখা দেয়ায় কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়ীর কাছে সাগরে অবস্থানরত এলএনজিবাহী ‘এক্সিলেন্স’ জাহাজটি থেকে খালাস ও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সাগর উত্তাল থাকায় ফুটো মেরামত ব্যাহত হচ্ছে। দেশে সর্বপ্রথম এলএনজি হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা সূচনা করতে গিয়ে যেখানে পাইপ লাইনসহ প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্রপাতি নতুন সংযোজনের কথা সেখানে একাধিক ফুটো কীভাবে থাকে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়েও সঙ্গত কারণেই রয়েছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রশ্নের সুরাহা না হলে জটিলতার ফাঁদেই আটকে থাকবে এলএনজি সরবরাহ। তাছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারা-সীতাকুণ্ড অংশে জাতীয় গ্রিডলাইন পর্যন্ত নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। এ অবস্থায় গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সাগরে নোঙররত অবস্থায় অলস দিন কাটাচ্ছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯শ’ ঘনমিটার (৬০ হাজার ৪৭ মেট্রিক টন) এলএনজিবাহী জাহাজটি। বিশাল এ জাহাজের পরিচালন (ফিক্সড অপারেটিং কস্ট) ব্যয় ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ দৈনিক ডেমারেজ বা লোকসান গুণতে হচ্ছে ৪০ হাজার ডলার। যা দেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকা। পেট্রোবাংলা এলএনজির আমদানিকারক। সুতরাং এই ক্ষতিপুরণ পেট্রোবাংলা তথা সরকারকেই গুণতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২৪ এপ্রিল আমেরিকান জ্বালানি কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালযুক্ত জাহাজ ‘এক্সিলেন্স’ মহেশখালীর অদূরে সমুদ্রে এসে পৌঁছায়। টার্মিনাল-জাহাজটি কাতার থেকে এলএনজির প্রথম চালান নিয়ে বাংলাদেশে আসে। এরপর প্রথম দফায় ২৫ বা ২৬ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফায় ১০ মে এবং পরে ২৬ মে পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহ উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ গত ২৬ মে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক এলএনজি সরবরাহ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনেরও সম্ভাব্য তারিখ রাখা হয়। কিন্তু পাইপলাইনে ত্রুটি ও গ্রিড লাইন নির্মাণকাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। সূত্রমতে, এদিকে গত এক মাসেরও বেশি সময়ে লোকসানের অঙ্ক সাড়ে ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তাছাড়া এলএনজির পরবর্তী আমদানি চালান কবে আসবে তাও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেশে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি তীব্র। মাহে রমজানে গ্যাসের চাপ আরও কমে গিয়ে রান্না-বান্না, শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ সীমাহীন। এলএনজি আমদানির মাধ্যমে গ্যাসের সংকট অনেকটা নিরসনের আশা করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। অথচ এলএনজি আমদানির পরও সরবরাহে জটিলতার ফাঁদে সাগরে ভাসছে জাহাজ। আর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দেশের মানুষ। অথচ ক্ষতিপুরণও গুণতে হচ্ছে সরকার তথা জনগণকেই। কর্ণফুলী ও তিতাস গ্যাস কোম্পানি এবং তাদের গ্রাহকরা এলএনজি সরবরাহের দিকে দীর্ঘদিন তাকিয়ে থেকে এখন চরম হতাশ। পেট্রোবাংলাও সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না কবে এলএনজির গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ‘আওতা বহির্ভূত কারণে’ দুই দফা পিছিয়ে যাওয়ার পর পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহের নতুন সময় নির্ধারণের কথা জানিয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। পুনঃনির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ১২ জুনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে সাগরের তলদেশে পাইপলাইনের মেরামত এবং চট্টগ্রামে জাতীয় গ্রিড লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার উপর। তাছাড়া মাতারবাড়ী সমুদ্রের টার্মিনাল পয়েন্ট থেকে আনোয়ারা হয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাতীয় গ্রিড লাইনে যদি অন্য কোনো কারিগরি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা জটিলতা দেখা দেয় তাহলে এলএনজি সরবরাহ আরও পিছিয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালযুক্ত এলএনজিবাহী ‘এক্সিলেন্স’ জাহাজ থেকে যে পাইপলাইনটি সাগরের তলদেশের পাইপলাইনে যুক্ত হবে সেখানেই কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে। এ ক্ষেত্রে পাইপলাইনের (সাব-সি) নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত এক্সিলারেট এনার্জির ডুবুরিরা প্রতিদিন কাজ করছেন। কিন্তু বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় ঠিকমতো কাজ করা যাচ্ছে না। ডুবুরিরা পানির নিচে দৈনিক ৩/৪ ঘণ্টা কাজ করেই বিশ্রামে যেতে হয়। তাদের দেয়া তথ্য মতে, পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহ শুরু করতে সবমিলিয়ে আরও দুসপ্তাহ’র মতো সময় লাগতে পারে। তবে ভিন্ন কোনো কারিগরি সমস্যা হলে সময়ও বাড়বে। এদিকে কাতারের রাস-গ্যাস কোম্পানির সাথে পেট্রোবাংলার চুক্তি অনুসারে বার্ষিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন এলএনজি আমদানির প্রথম চালানের গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ না হওয়ায় পরবর্তী চালান আটকে গেছে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালী জিটিসিএল-এর স্টেশন (কক্সবাজার) থেকে ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন দিয়ে চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা হয়ে এলএনজির সরবরাহ জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে যোগ হবে। টার্মিনালটি দিয়ে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৪৬০ মিলিয়ন (৪৫ থেকে ৫০ কোটি) ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে। ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ নেবে এক্সিলারেট এনার্জি। সাগরে ভাসমান টার্মিনালের অবস্থান থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটারের সাব-সি পাইপলাইন দিয়ে এই গ্যাস জিটিসিএল-এর স্টেশনে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ এবং সরবরাহ-পূর্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে আনোয়ারা থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের আরও ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। অথচ এখানেই পাইপলাইন জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্রমতে, ফুটো সারাতে পাইপলাইনের অন্তত ১০টি পয়েন্টে ওয়েল্ডিং করতে হবে। এরজন্য এক্সিলারেট এনার্জির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য ওশেন আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র চেয়েছে। ৪ জুন কাজ শুরু করে ২ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার শর্ত দেয়া হয়। দ্য ওশেন কর্মকর্তাদের তদারকিতে পাইপলাইন মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। এই টার্মিনাল থেকে কী পরিমাণ এলএনজি পাওয়া যাবে? মাতারবাড়ী টার্মিনালের রি-গ্যাসিফিকেশন অর্থাৎ এলএনজি থেকে গ্যাসে রূপান্তরের ক্ষমতা দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৬৫ থেকে ২৭৫ ঘনফুট গ্যাস মিলছে। চট্টগ্রামে ৫০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এলএনজি থেকে রূপান্তরিত গ্যাসের অর্ধেক অর্থাৎ ২৫ কোটি ঘনফুট চট্টগ্রামের ঘাটতি আংশিক পূরণের জন্য কর্তৃপক্ষ জোগান দেবে। তবে দেশে গ্যাসক্ষেত্রের তুলনায় আমদানিকৃত এলএনজির মূল্য বেশি হওয়ায় গ্যাসের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া সার্বিকভাবে গ্যাসের বিরাট ঘাটতির তুলনায় এলএনজি থেকে রূপান্তরিত গ্যাসের সরবরাহ অনেক কম হওয়ার ফলে দেশে বিদ্যমান গ্যাস সঙ্কট আপাতত দূরীভূত হচ্ছে না।

Comments are closed.

More News...

Fatal error: Call to undefined function tie_post_class() in /var/sites/s/sorejominbarta.com/public_html/wp-content/themes/bdsangbad_magazine_themes/includes/more-news.php on line 40